যুদ্ধের অভিঘাত কখনো কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। গোলার শব্দ সীমান্ত পেরোয়, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসযজ্ঞ অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে, জ্বালানির সংকট খাদ্যশস্যের মূল্য বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তার বোঝা বহন করতে হয় পৃথিবীর সাধারণ মানুষকেই। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাবলি আবারও সেই নির্মম সত্যটি আমাদের সামনে উপস্থিত করেছে।
শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের নিরাপত্তা, প্রতিশোধ কিংবা কৌশলগত স্বার্থের হিসাব কষে, তখন সেই হিসাবের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় নিরস্ত্র জনগণকে। এমনকি একটি দেশের বিয়ে বাড়িতেও অনুষ্ঠান চলাকালে ক্ষেপণাস্ত্রের শার্পনেলের আঘাতে এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে।
যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা হলো—কোনো পক্ষের ঘোষিত লক্ষ্য যদি সামরিক স্থাপনাও হয়, ধ্বংসের পরিধি অনেক সময় তার সীমা মানে না। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকে আরও বড় সংঘাতের সম্ভাবনা। একটি হামলা আরেকটি হামলার অজুহাত হয়, প্রতিশোধ জন্ম দেয় পাল্টা প্রতিশোধের। এইভাবেই সংঘাত ক্রমে এমন এক ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করে, যা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
শক্তিধরদেরও মনে রাখতে হবে—মানচিত্রে সীমান্ত থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের বেদনার কোনো সীমান্ত নেই। যুদ্ধ জিতে কোনো রাষ্ট্র হয়তো সাময়িক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারে—কিন্তু মানবতার পরাজয়ের মধ্যে কোনো বিজয়ই প্রকৃত বিজয় নয়
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই সংঘাতের প্রভাব যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে ইতিমধ্যে বৃহত্তর বিশ্ব অর্থনীতিকে স্পর্শ করছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তেলের মূল্য বাড়লে তার অভিঘাত পড়ে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প ও কৃষিতে। সার উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে, সেচ ও কৃষিযন্ত্র পরিচালনার খরচ বাড়ে, খাদ্য পরিবহনের ব্যয়ও ঊর্ধ্বমুখী হয়। অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন যেখানে জ্বলছে, ক্ষুধার উত্তাপ তার বহু দূরেও অনুভূত হয়। এখানেই প্রশ্ন—পৃথিবী কি কেবল শক্তিধরদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল? প্রায় ৮৪০ কোটির বেশি মানুষের এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ কেন বারবার এমন সিদ্ধান্তের পরিণতি বহন করবে, যা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই?
উত্তরটি সহজ নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মিলে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণ করেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ প্রায়ই ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছায় না। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, কৌশলগত সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের অভিঘাত যখন বাজারে প্রতিফলিত হয়, তখন ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য আরও প্রকট হয়। সচ্ছল মানুষ বাড়তি ব্যয় সামলাতে পারে, কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য ব্যয় সংকোচন মানে অনেক সময় একবেলা আহার কমিয়ে দেওয়া।
আরও ভয়াবহ হলো মানুষের অনুভূতির ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যাওয়া। দূরদেশের একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের কাছে যখন কেবল একটি সংবাদসংখ্যা, তখন যুদ্ধের মানবিক মূল্যও আমাদের কাছে ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। নিহতের সংখ্যা বাড়ে, আহতের সংখ্যা বাড়ে—কিন্তু পরিসংখ্যানের আড়ালে যে প্রত্যেকটি মানুষ একটি পূর্ণ জীবন, একটি পরিবার ও একটি স্বপ্ন বহন করত, তা আমরা ভুলে যাই। সুতরাং, এই সংকটের সমাধান কেবল আরও অস্ত্র, আরও নিষেধাজ্ঞা কিংবা আরও শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে নেই। প্রয়োজন সংযম, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি কার্যকর সম্মান। প্রয়োজন এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যুক্তি অন্য রাষ্ট্রের নিরস্ত্র মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে না।
পৃথিবী কোনো পরাশক্তির ব্যক্তিগত খেলাঘর নয়। এটি ৮৪০ কোটির বেশি মানুষের অভিন্ন আবাস। সেই আবাসে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কয়েকটি ক্ষমতাকেন্দ্রে নেওয়া হলেও তার অশ্রু ঝরে সর্বত্র। অতএব শক্তিধরদেরও মনে রাখতে হবে—মানচিত্রে সীমান্ত থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের বেদনার কোনো সীমান্ত নেই। যুদ্ধ জিতে কোনো রাষ্ট্র হয়তো সাময়িক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারে—কিন্তু মানবতার পরাজয়ের মধ্যে কোনো বিজয়ই প্রকৃত বিজয় নয়।













