৭ সেপ্টেম্বর ছিল ‘পুলিশ সহযোগিতা দিবস’। দিবসটির নামকরণের মধ্যেই যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিহিত রয়েছে। কারণ, ‘সহযোগিতা’ কেবল পুলিশের কাছ থেকে পাওয়ার বিষয় নয়, এই ক্ষেত্রে বরং পুলিশের জন্যও আমাদের সহযোগিতার বিষয়টি সামনে চলে আসে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জানমালের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, দুর্যোগ ও সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ যখন বিপদে পড়ে আশ্রয় খোঁজে, তখন থানাপুলিশই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসাস্থল। এটি যেন বাংলা নাটকের ঠিক সেই চমৎকার গানের কথার মতো—‘অর্ধেক দেবতা তুমি, অর্ধেক পুলিশ’। কথাটি নিছক রসিকতা হলেও পুলিশের দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে এর একধরনের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রকৃতপক্ষে পুলিশের চাকরি অন্য ১০টি চাকরির মতো নয়। সুবিশাল এই বাহিনীর সদস্যরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালনে রত থাকেন। অথচ দুঃখজনকভাবে বিগত কয়েক বছর ধরে তারা অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করছেন। বিশেষত, ’২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাহিনীটি অভূতপূর্ব সংকটের মুখে পড়ে যায়। দেশের বহু থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের একটি বড় অংশ কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর পুলিশ ধীরে ধীরে দায়িত্বে ফিরেছে বটে; কিন্তু আস্থা ও মনোবলের সংকট কাটিয়ে একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করা সহজ কাজ নয়।
ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও পুলিশের ওপর একাধিক হামলার খবর আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, থানায় হামলার ঘটনা ঘটছে; কোথাও সড়কে ট্রাফিক পুলিশকে প্রকাশ্যে মারধর করা হচ্ছে; কোথাও আবার অপরাধী ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। সর্বশেষ সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের এক সদস্যকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা স্বভাবতই সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন হামলায় ৩৬১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে আহত হন ৬০১ জন। অর্থাৎ, বিগত ১৯ মাসে প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানকে কি কোনোভাবে স্বাভাবিক বলা যায়?
কোনো পুলিশ সদস্যের অন্যায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে তার জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু সেই অভিযোগের কারণে পুরো বাহিনীকে শত্রু কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, পুলিশের ওপর হামলা রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতার ওপর আঘাতের শামিল। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সেখানে পুলিশকে কেবল ‘শক্তি প্রয়োগকারী বাহিনী’ হিসেবে দেখা হয় না, বরং তাদের কাছে পুলিশ হলো ‘জনগণের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান’। এর পাশাপাশি পুলিশের ক্ষমতার ওপর থাকে শক্তিশালী জবাবদিহি ও স্বাধীন তদারকি। তবে দুঃখজনকভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের সমাজব্যবস্থায় পুলিশিং এখনো ততটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি।
প্রশ্ন হলো, যে পুলিশ সব সময় এতটা দায়িত্ব এবং চাপের মধ্যে থাকে, তাদের প্রতিই কেন অহর্নিশ আঙুল তোলা হবে? পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দেওয়া যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। পুলিশ দুর্বল হলে আইন দুর্বল হয়ে পড়ে, আর আইন দুর্বল হলে শক্তিশালী হয় অপরাধীরা। মূলত এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের সংস্কার ও পুনর্গঠনের দাবি রয়েছে। পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনার স্বার্থে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, ঝুঁকি মূল্যায়ন, মানসিক সহায়তা এবং দায়িত্ব পালনের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও দীর্ঘদিনের। তবে পরিতাপের বিষয়, বিভিন্ন সময় এসব বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে এর অধিকাংশই আলোর মুখ দেখেনি।
মনে রাখা দরকার—সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল পুলিশ জনগণের বন্ধু। তাই পুলিশকে ভয়ের নয়, বরং আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের দিতে হবে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক মর্যাদা। আমরা মানবিক পুলিশ চাইব; কিন্তু পুলিশের প্রতি মানবিক আচরণ করব না—এই দ্বিমুখী প্রবণতা নিয়ে আর যা-ই হোক, ‘জনবান্ধব পুলিশিং’ প্রত্যাশা করা অমূলক।












