সসম্প্রতি ডার্ক ওয়েবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত বিক্রির বিজ্ঞাপন ঘিরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। ‘ম্যাডারক্স’ নামে পরিচয় দেওয়া একটি হ্যাকার গ্রুপ বাংলাদেশের জনপ্রিয় চাকরির ওয়েবসাইট বিডিজবসের প্রায় ৬০ লাখ ব্যবহারকারীর সিভি নিজেদের হাতে থাকার দাবি করেছে। যদিও বিডিজবস কর্তৃপক্ষ সেই দাবি সরাসরি নাকচ করেছে, তথাপি ১৪৮টি সিভির নমুনা প্রকাশ এবং তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্তের দাবি রাখে। এটিকে নিছক একটি সাইবার নিরাপত্তার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিষয়টি স্পর্শকাতরও বটে। কারণ, চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্তে শুধু নাম বা মোবাইল ফোন নম্বরই নয়, থাকে ঠিকানা, ইমেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্ম-অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণসহ ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এসব তথ্য এক জায়গায় করে একজন মানুষের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা যায় অনায়াসে। ফলে এমন তথ্য কোনোভাবে অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে পড়লে লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, পরিচয় জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি বেড়ে যায় বহু গুণ। খোদ ইউরোপীয় ডাটা প্রোটেকশন বোর্ড (ইডিপিবি) ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের সম্ভাব্য পরিণতির মধ্যে এ ধরনের পরিচয় চুরি, প্রতারণা ও আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, ইডিপিবি হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি স্বাধীন সংস্থা, যারা ইউরোপজুড়ে সাধারণ তথ্য সুরক্ষা প্রবিধান (জিডিপিআর) এবং ডেটা সুরক্ষা নিয়মগুলোর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করে থাকে।
কেবল পাসওয়ার্ড ও ফায়ারওয়াল থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, তথ্যের প্রয়োজনীয়তা যাচাই, তথ্যভান্ডারে সীমিত প্রবেশাধিকার, এনক্রিপশন, নজরদারি এবং তথ্য ফাঁসের পর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ—সবকিছুই নিশ্চিত করা প্রয়োজন
আশঙ্কার বড় কারণ হলো, এই তথ্য যদি সত্যিই কোনো অননুমোদিত পক্ষের হাতে গিয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এটি ঘটল কীভাবে? আর যদি দাবি সত্য না হয়, তাহলে প্রকাশিত নমুনাগুলোর উৎসই বা কী? সুতরাং, কেবল দাবি অস্বীকার করে দায়িত্ব শেষ করলেই চলবে না; স্বাধীন তদন্ত, প্রযুক্তিগত যাচাই এবং প্রয়োজনবোধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এভাবে তথ্য বেহাত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে যথাযথ তদারক করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন নিশ্চয়ই।
উন্নত বিশ্বে আমরা কী দেখি? সেখানে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে নিছক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপিআর অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাধারণত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অবহিত করার বিধান রয়েছে; উচ্চ ঝুঁকি থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেও জানাতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজিও তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অতএব, আমরাও কেন ব্যক্তিগত তথ্যকে ‘সম্পদ’ এবং নিরাপত্তাকে ‘দায়িত্ব’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলব না? চাকরির ওয়েবসাইট, ব্যাংক, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি-বেসরকারি যেকোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করা হলে সেই তথ্য সুরক্ষার দায়ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। কেবল পাসওয়ার্ড ও ফায়ারওয়াল থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, তথ্যের প্রয়োজনীয়তা যাচাই, তথ্যভান্ডারে সীমিত প্রবেশাধিকার, এনক্রিপশন, নজরদারি এবং তথ্য ফাঁসের পর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ—সবকিছুই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন ‘ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার’, তথা তথ্যই শক্তি। ঠিক এই রকম একটি সময়ে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত না থাকলে সেই শক্তিই উল্টো তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, তথ্য ফাঁসকে কোনো সাধারণ কারিগরি ত্রুটি নয়; বরং এটিকে মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মান ও ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি আঘাতের শামিল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা কিংবা গাফিলতির কারণে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অপরাধীদের হাতে চলে গেলে, তার দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। পাশাপাশি এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে, নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করার সময় যথাযথ সতর্কতা ও নিরাপত্তা অবলম্বন করা। কারণ, নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করা যত সহজ, সেই তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় ঠিক ততই গুরুত্বপূর্ণ।













