মাদকাসক্তি একটি গুরুতর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা। প্রায় প্রতিটি দেশকেই কমবেশি এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। একজন মানুষ যখন মাদকের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়েন, তখন তাকে শাস্তি না দিয়ে বরং চিকিৎসা এবং যথাযথ পুনর্বাসনের আওতায় আনাই সভ্য সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। অবশ্য সব সমাজেই এই কাজটি করার জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান থাকে, যেমন—আমাদের রয়েছে মাদক নিরাময়কেন্দ্র বা সংক্ষেপে ‘রিহ্যাব’। আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ।
তবে দুঃখজনক হলো, দেশের মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রগুলোর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের এক নির্মম এবং ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, যা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং আমাদের বিবেককেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। জানা গেছে, দেশের পাঁচ শতাধিক মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের অনেকগুলোই ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা না দিয়েই রোগীকে দিনের পর দিন আটকে রাখা, মারধরসহ নানা ধরনের নির্যাতন করে থাকে। কোথাও কোথাও নিরাময়ের পরিবর্তে কেন্দ্রের অভ্যন্তরেই মাদক সরবরাহ করা হয়ে থাকে—কী সাংঘাতিক কথা! রোগী ভর্তির পর নানা অজুহাতে অর্থ আদায়, অধিক অর্থের জন্য চিকিৎসার মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া—এমন অভিযোগও কম নয়।
অর্থাৎ, যেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনা, তাদের কোনো কোনোটি যেন সেই অন্ধকারকেই পরিণত করেছে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ারে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ কিংবা সম্পত্তির দ্বন্দ্বের জেরে সুস্থ মানুষকে পর্যন্ত মাদকাসক্ত সাজিয়ে নিরাময়কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়!
হাড় হিম করা আরও অভিযোগ হলো, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পপতিরাও পর্যন্ত এই জালে আটকে পড়েন অনেক সময়, যেখানে এমনও ঘটে—মাদক দূরের কথা, জীবনে কোনো দিন তিনি একটি সিগারেটেও টান দেননি। অথচ সম্পত্তির লোভে নিজের সন্তানের স্বার্থের বলি হয়ে তিনি বন্দি হয়েছেন অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মধ্যে—শত চেষ্টা করেও মুক্তি মিলছে না।
কথিত ‘ক্যাচিং পার্টি’র মাধ্যমে কাউকে ধরে এনে এইভাবে ‘বন্দি’ করার অভিযোগ যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তা আর নিছক অনিয়ম থাকে না, বরং হয়ে ওঠে নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন—অপরাধ। সেই ক্ষেত্রে সব নিরাময়কেন্দ্রকে চিকিৎসালয় না বলে ‘গোপন কারাগার’ বলাই অধিক সমুচিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের আহ্বান হলো, মাদকাসক্তির চিকিৎসা হতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক, মানবিক ও অধিকারসম্মত। রোগীর মর্যাদা, গোপনীয়তা ও সম্মতি রক্ষা করাও সর্বদা চিকিৎসার মৌলিক শর্ত। সুতরাং, চিকিৎসার স্থানগুলোতে নির্যাতন বা অমানবিক আচরণ কখনোই চিকিৎসার অংশ হতে পারে না। উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, সেখানে সব মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, নার্স, সমাজকর্মীসহ প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশের নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো যেন মাদক সেন্টার হয়ে উঠেছে। এটি সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে ভীতি-জাগানিয়া খবর।
এই যখন অবস্থা, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কেবল ‘লাইসেন্স প্রদান’ করে দায়িত্ব শেষ করলেই চলবে না; প্রতিটি কেন্দ্রে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও জনবলের উপস্থিতি, রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা-নথির কঠোর যাচাই এবং অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ কেন্দ্র বন্ধের পাশাপাশি নির্যাতন, জবরদস্তি আটক কিংবা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিতে হবে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি চিকিৎসার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া এবং তা অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করার মতো শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ভুলে যাওয়া চলবে না, মাদকাসক্ত ব্যক্তি সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পেলে সুস্থ হয়ে মূলধারার জনস্রোতে অনায়াসে যুক্ত হতে পারেন। অতএব, এখনই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, নইলে ‘নিরাময়কেন্দ্র’ নামটি মানুষের কাছে ক্রমশ আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়াবে।













