রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নারীর চলাচল এখনো একধরনের নিত্যযুদ্ধ। কর্মজীবী নারীকে অফিসে পৌঁছাতে হবে, শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হবে, গৃহিণীকে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে বাইরে বের হতেই হবে; কিন্তু গণপরিবহনে ওঠার মুহূর্ত থেকেই তাদের অনেকের মধ্যে শুরু হয় একধরনের অস্বস্তিকর উৎকণ্ঠা। বাসে অতিরিক্ত ভিড়, ওঠানামার সময় ধাক্কাধাক্কি, আসন দখল, অশোভন আচরণ, শারীরিক হয়রানি, কটূক্তি, অনিরাপদ বাসস্টপ এবং সন্ধ্যার পর পরিবহনের অনিশ্চয়তা নারীর নগরজীবনকে কঠিন করে তোলে। গণপরিবহন তার চলার পথের স্বস্তিদায়ক সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সেটিই অনেক সময় হয়ে ওঠে তার ভয়ের আঁধার।
এই বাস্তবতার মধ্যে রাজধানীর ৯টি রুটে বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারীদের নিয়োগ—এই উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। এতে নারীর নিরাপদ যাতায়াতের পাশাপাশি পরিবহন খাতে নারীর কর্মসংস্থানের একটি নতুন দরজাও খুলতে পারে। ঢাকার বাইরে বগুড়া ও চট্টগ্রামেও এই সেবা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। ফলে এটি কেবল কয়েকটি বাস চালুর ঘটনা না হয়ে একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা আমাদের আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক হতেও বাধ্য করে। জনবান্ধব অনেক উদ্যোগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার গ্রহণ করেছে। সেগুলোর ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধন করা হয়েছে, প্রচার করা হয়েছে, কিছুদিন মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনাও দেখা গেছে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থায়ন অথবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সেই উদ্যোগের অনেকগুলোই গুরুত্ব হারিয়েছে। ঢাকায় নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হয়নি। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা পিংক বাসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিবেচনায় রাখা জরুরি।
আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাদের আমাদের অর্ধেক আকাশ। অর্ধেক আকাশ অন্ধকার থাকলে তা দেশের জন্যও মঙ্গলজনক নয়। নারীর চলাচলের স্বাধীনতা একটি শহরের সভ্যতার অন্যতম পরিমাপক। পিংক বাস সেই স্বাধীনতার পথে একটি ছোট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
প্রথমত, পিংক বাসকে প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না, এটিকে গণপরিবহন ব্যবস্থার স্থায়ী অংশ করতে হবে। কতটি বাস চলল, তা উদ্বোধনের দিন গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছয় মাস পরে কতটি বাস নিয়মিত চলছে, নির্ধারিত সময়ে যাত্রী পাচ্ছে কি না, বিকল বাস কত দ্রুত মেরামত হচ্ছে, সেবার মান কেমন—সেটিই সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
দ্বিতীয়ত, শুধু বাসের ভেতরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। বাসস্টপ, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের স্থান, আলোকব্যবস্থা এবং বাসে ওঠানামার পরিবেশও নিরাপদ করতে হবে। নারীরা যেন নির্দিষ্ট সময়ের পর পিংক বাসের অপেক্ষায় রাস্তার পাশে বিপন্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে না থাকেন, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার। রুট নির্বাচনেও নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কোন পথে নারীর যাতায়াত বেশি, কোন সময়ে চাপ বেশি, কোথায় বাসের প্রয়োজন বাড়ছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে রুট ও সময়সূচি প্রণয়ন করা জরুরি।
তৃতীয়ত, নারী চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগের উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা আবশ্যক। নারীকে সামনে এনে বাস চালু করে পরে সেই নারীদেরই কর্মক্ষেত্রে অনিরাপদ রাখা হলে উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সুতরাং, আমরা আশা করব—যে মহতী উদ্দেশ্য নিয়ে পিংক বাস চালু করা হলো, তা যেন ব্যর্থ না হয়। আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাদের আমাদের অর্ধেক আকাশ। অর্ধেক আকাশ অন্ধকার থাকলে তা দেশের জন্যও মঙ্গলজনক নয়। নারীর চলাচলের স্বাধীনতা একটি শহরের সভ্যতার অন্যতম পরিমাপক। পিংক বাস সেই স্বাধীনতার পথে একটি ছোট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর সাফল্য কেবল একটি পরিবহনসেবার সাফল্য নয়, এটি অর্ধেক আকাশকে স্বস্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিশ্চয়তা প্রদানের একটি মূল্যবান পদক্ষেপ।













