এএকটি জাতির ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে তরুণদের মস্তিষ্কে ও মনে। সেই তরুণদের মনে যদি পরিশ্রমের পরিবর্তে দ্রুত লাভের আকাঙ্ক্ষা, সৃষ্টির পরিবর্তে ভাগ্যের ওপর নির্ভরতা এবং জ্ঞানের পরিবর্তে জুয়ার উত্তেজনা জায়গা করে নেয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু ব্যক্তির হয় না, সমাজের ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি নতুন অনলাইন জুয়ার সাইট খোলা হচ্ছে। পহেলা মে থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৫৮৬টি জুয়ার সাইট সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সাইটে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে বলে পুলিশের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এই বিপুল অর্থের হিসাবের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় একটি ক্ষতির হিসাব। একজন তরুণ জুয়ার পেছনে যে সময় হারায়, যে মনোযোগ হারায়, যে চিন্তার শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় করে, তা সহজে ফিরে আসে না। কয়েক ঘণ্টা পড়াশোনা করার কথা ছিল, সেই কয়েক ঘণ্টা কেটে যায় জুয়ার ফলাফলের অপেক্ষায়। যে মেধা নতুন কোনো ধারণা, গবেষণা কিংবা সৃষ্টিশীল কাজে লাগতে পারত, তা ব্যস্ত থাকে কীভাবে দ্রুত টাকা পাওয়া যায় সেই চিন্তায়।
আইন দিয়ে তরুণদের মনকে পাহারা দেওয়া যায় না। সাইট বন্ধ করা যায়, হিসাব ফ্রিজ করা যায়, অপরাধী গ্রেপ্তার করা যায়। কিন্তু লোভের যে বীজ ইতিমধ্যে মনের ভেতরে ঢুকে গেছে, তা দূর করতে শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। এ অবস্থায় পরিবারকে সন্তানের অনলাইন জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে
জুয়া মানুষের ভেতরে একটি বিপজ্জনক ধারণার জন্ম দেয়। পরিশ্রম করে ধীরে ধীরে অর্জন করার প্রয়োজন কী? অল্প সময়ে অনেক টাকা পাওয়া গেলে এত শ্রমের প্রয়োজন কোথায়? তারুণ্যের মন স্বভাবতই স্বপ্নময়। সেখানে কৌতূহল থাকে, সাহস থাকে, ঝুঁকি নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। অনলাইন জুয়ার ব্যবসা সেই স্বাভাবিক ঝুঁকিপ্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে লোভে পরিণত করে। প্রথমে সামান্য টাকা, পরে আরও কিছু। একবার জিতলে মনে হয়, আবার জিতব। হারলে মনে হয়, এবার হারানো টাকা তুলে আনব। অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এখানেই। এটি তরুণদের শুধু টাকা হারাতে শেখায় না, হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আরও টাকা ঝুঁকিতে ফেলতেও শেখায়।
এই অপরাধের অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুতর। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব জুয়ার লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে। জুয়ার অর্থের একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। এই বিপদের গুরুত্ব সরকার বুঝেছে বলেই জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ প্রণীত হয়েছে। আইনে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ভুয়া এমএফএস হিসাব, ক্রিপ্টোকারেন্সি, মিরর সাইট, জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রে কঠোর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। কিন্তু আইন দিয়ে তরুণদের মনকে পাহারা দেওয়া যায় না। সাইট বন্ধ করা যায়, হিসাব ফ্রিজ করা যায়, অপরাধী গ্রেপ্তার করা যায়। কিন্তু লোভের যে বীজ ইতিমধ্যে মনের ভেতরে ঢুকে গেছে, তা দূর করতে শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। এ অবস্থায় পরিবারকে সন্তানের অনলাইন জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও দ্রুত লাভের মোহ, অনলাইন প্রতারণা ও জুয়ার মানসিক ফাঁদ সম্পর্কে তরুণদের জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার প্রচারণাকে স্বাভাবিক বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
সুতরাং রাষ্ট্রের কাজও শুধু সাইট বন্ধ করা নয়। অর্থের প্রবাহ অনুসরণ করতে হবে, এজেন্ট নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার উৎস শনাক্ত করতে হবে এবং বিদেশি নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তারুণ্যকে আমরা কী দিতে চাই? একটি মোবাইল ফোন, যার পর্দায় প্রতিদিন নতুন জুয়ার সাইট খুলবে? নাকি এমন একটি ভবিষ্যৎ—যেখানে তারা জ্ঞান, শ্রম ও মেধা দিয়ে নিজেদের জীবন নির্মাণ করবে? জুয়া মানুষের অর্থ খায়, সময় খায়, মেধা খায়। শেষ পর্যন্ত এটি মানুষের মন ও স্বপ্নও খেতে শুরু করে। সেই ক্ষুধার্ত অন্ধকার থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনতেই হবে।












