একটি জনপদকে উন্নত, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাশীল করিয়া তুলিবার জন্য সর্বপ্রথম যাহার প্রয়োজন, তাহা হইল স্বাধীনতা। পরাধীন জাতির নিকট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিলাস মাত্র—স্বাধীনতাই তাহাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দেয়, তাহার ভাগ্য নিজ হাতে গড়িবার সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে সেই ঐতিহাসিক সুযোগ লাভ করিয়াছিল। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আমাদের সামনে এক সুবিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলিয়া দিয়াছিল।
বিংশ শতকে বহু দেশ ঔপনিবেশিক শাসন হইতে মুক্তি লাভ করিয়াছে। কাগজে-কলমে প্রায় সকলেই স্বাধীন রাষ্ট্র; কিন্তু বাস্তবে সকলের ভাগ্য এক নহে। কিছু দেশ স্বাধীনতার পর কয়েক দশকের মধ্যেই স্থিতিশীল ও সক্ষম রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হইয়াছে, আবার কিছু দেশ অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করিয়াও দারিদ্র্য, বিভাজন ও অস্থিরতার দুষ্টচক্র ভাঙিতে পারে নাই। ইহার মূল বিষয়টি নিহিত রহিয়াছে সেই সকল রাষ্ট্রের ঐক্য এবং অনৈক্যের মধ্যে।
আফ্রিকার বতসোয়ানা এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ১৯৬৬ সালে স্বাধীনতা লাভকালে দেশটি ছিল চরম দরিদ্র, অবকাঠামোবিহীন ও ভূমিবেষ্টিত; কিন্তু স্বাধীনতার পর নেতৃত্ব একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে—জাতিগত বিভাজনকে রাজনীতির কেন্দ্রে স্থান না দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রাখা। হীরকসম্পদের আয় লুণ্ঠনের বস্তু না হইয়া জাতীয় উন্নয়নের পুঁজি হইয়াছে। ফলত, আফ্রিকার বহু দেশের বিপরীতে বতসোয়ানা স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা ও তুলনামূলক সমৃদ্ধ অর্থনীতির উদাহরণে পরিণত হয়। ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা আরো একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। দীর্ঘ যুদ্ধ, ভয়াবহ ধ্বংস ও আন্তর্জাতিক অবরোধের পর ১৯৭৫ সালে দেশটি স্বাধীন ও একীভূত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। প্রথম পর্যায়ে কথিত আদর্শবাদী রাষ্ট্রনীতি অর্থনৈতিক স্থবিরতা ডাকিয়া আনে; কিন্তু আশির দশকে নেতৃত্ব বাস্তবতার মুখোমুখি হইতে দ্বিধা করে নাই। রাষ্ট্রীয় ঐক্য বজায় রাখিয়া অর্থনীতিকে উত্পাদন ও রপ্তানিনির্ভর পথে পরিচালিত করে। ইহা আমাদের এই বার্তা দেয়—স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দশকে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত মারাত্মক হইতে পারে; কিন্তু নেতৃত্ব যদি আত্মসমালোচনায় সক্ষম হয়, যদি ঐক্য থাকে, তাহা হইলে সেই জনপদে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসিবেই। ইউরোপে এস্তোনিয়ার অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রগঠনের আরেকটি পাঠ দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভ করা এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি বুঝিয়াছিল—পুরাতন কাঠামো বহন করিয়া নূতন রাষ্ট্র গড়া যায় না। তাহারা সচেতনভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিহার করিয়া অত্যাধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। এস্তোনিয়া প্রমাণ করিয়াছে, জনসংখ্যা বা প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির অন্তরায় হয় না।
আরো কঠিন বাস্তবতার মধ্য হইতে উঠিয়া আসা একটি দৃষ্টান্ত রুয়ান্ডা। ১৯৯৪ সালের গণহত্যা রাষ্ট্রটিকে প্রায় ধ্বংস করিয়া দিয়াছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় নীতিতে জাতিগত পরিচয়কে রাজনীতির বাইরে রাখিবার কঠোর সিদ্ধান্ত লওয়া হয়। জাতীয় ঐক্যকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ভিত্তি করিয়া পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। যদিও শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক দিক লইয়া বিতর্ক বিদ্যমান, তথাপি রাষ্ট্রগঠনের ক্ষেত্রে ঐক্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলাফল অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু একই সময়ে আমরা দেখিতে পাই, আফ্রিকার বহু দেশ—কঙ্গো, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান কিংবা সোমালিয়া—যাহারা স্বাধীনতা অর্জনের পরও দীর্ঘকাল গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ থাকিয়াছে।
স্পষ্টতই স্বাধীনতার পর একটি রাষ্ট্রের জন্য সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় সম্পদ হইল তাহার জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংকল্প। বাংলাদেশের সেই ঐক্যের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে ছিল; কিন্তু উভয় দিকের গোড়া মতাদর্শ, অনৈক্য তথা ব্যাপক বিভাজন আমাদের বিপুল সম্ভাবনার গলা টিপিয়া ধরে। এই সকল অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বিষয় স্পষ্ট হইয়া উঠে—স্বাধীনতার পর সবচাইতে বড় শত্রু বাহিরের শক্তি নহে, বরং অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও প্রায় সকল ক্ষেত্রে দুর্বল নেতৃত্ব। প্রশ্ন হইল—আমরা সেই ঐক্যের শিক্ষা গ্রহণে কবে প্রস্তুত হইব?













