সরস্বতীবন্দনায় বলা হয়েছে ‘যা কুন্দেন্দু তুষার হার ধবলা/ যা শুভ্রাবস্ত্রাবৃতা/ যা বীণাবরদমণ্ডিত করা/ যা শ্বেত পদ্মাসনা। যিনি কুন্দফুল, চাঁদ, বরফের মতো শ্বেতবর্ণা, মুক্তাহার ও শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, যিনি শ্বেতপদ্ম অধিষ্ঠিত ও বীণাবাদিনী—তিনি হচ্ছেন মা সরস্বতী। দেবীর ধ্যানমন্ত্রে দেখি মা সর্বশুক্লা। যিনি চাঁদের ন্যায় শুভ্রাবর্ণা। শুভ্রবর্ণ শুদ্ধ, পবিত্রতা ও জ্ঞানের প্রতীক।
বিশুদ্ধ নির্মল জ্ঞান মানুষকে যথার্থ মানুষ করে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা লাভ করে। এই শিক্ষালাভের সঙ্গে যদি প্রকৃত জ্ঞান অর্জন না করে, তাহলে সমাজ উপকৃত হবে না। নিজ নিজ পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে ভালো বই পড়তে হবে। মহামনীষীদের বাণীর সঙ্গে সবাইকে পরিচিত হতে হবে। বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ওপরের দিকে যেতে হবে। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গা থেকে সুশিক্ষার আলোকে আলোকিত হব।
শাস্ত্রে বলা হচ্ছে, ‘বিদ্যা আর রাজপদ কখনো তুল্য নয়/ বিদ্বান রাজার চেয়েও সম্মানিত হয়/ রাজা শুধু পূজা পান আপন রাজ্যতে/ বিদ্বান পূজিত হয় সারা ধরণীতে। শাস্ত্র সিদ্ধান্ত দিয়েছে, বিদ্বান ব্যক্তি একজন রাজার চেয়ে সম্মানিত। সৃষ্টিশীল কাজ করতে না পারলে একজন রাজাকে নিজের দেশেও সম্মান করে না। অন্যদিকে একজন বিদ্বান ব্যক্তি পৃথিবীর জন্য অলংকার। তিনি শক্তি এবং লেখনীর অপূর্ব সমন্বয়ে পৃথিবীর সব মানুষের মঙ্গল সাধন করেন। তিনি নিজে শ্রদ্ধাবান হন এবং অন্যকে শ্রদ্ধার মন্ত্র শিখিয়ে দেন। শ্রদ্ধা জানানোই হচ্ছে পূজা। শ্রীশ্রীগীতায় বলা হয়েছে, ‘শ্রদ্ধাবান ব্যক্তিই জ্ঞান লাভ করতে পারেন।’ এই জ্ঞান লাভের অদম্য উত্সাহ নিয়ে আমরা সরস্বতীপূজা করি।
সরস্বতীর অন্য নাম বাগেদবী ঋগ্বেদে বাগেদবী ত্রয়ী মূর্তি। ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ—ইলা, সরস্বতী, ভারতী। অনন্ত শক্তি ও জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক এই সরস্বতী। তাই তিনি বাগেদবী। পৌষসংক্রান্তি বা উত্তরায়ণের পরে শুক্লপক্ষের শ্রীপঞ্চমী তিথিতে বিদ্যার্থী, জ্ঞান লাভেচ্ছু ভক্তবৃন্দ জ্ঞান লাভের প্রাপ্তির আশায় সরস্বতীপূজা করেন। আদর্শগতভাবে পূজাবিরোধী কিন্তু সরস্বতীপূজার সামাজিক গুরুত্ব অনুধাবন করে একজন খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ইংরেজি ঐতিহাসিক বলেছিলেন, ‘সর্বশুক্লা পদ্মাসীনা হংসবাহনা একটি মূর্তি আমাকে দাও, যার এক হাতে পুস্তক এবং অন্য হাতে বীণা।’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যে অমৃতভাষিণী মধুকরী কল্পনাকে আহ্বান করেছেন।
দেবীকাঠামোতে দেখি মা সরস্বতী পদ্মাসনা। পদ্মকে বলা হয় পঙ্কজ। এই পদ্ম ফুল কাদায় জন্মে। অথচ কাদার লেশমাত্র পদ্ম ফুলে থাকে না। আমরা প্রত্যেকে মায়াময় সংসারে আছি। যেখানে রয়েছে হিংসা, বিদ্বেষ, আত্মঅহমিকা। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলে এগুলো ত্যাগ করে জীবনকে পদ্মের মতো সুশোভিত করতে হবে।
প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর একান্ত কর্তব্য বিবেক দ্বারা নিত্যবস্তুর সারবার্তা ও অনিত্য বস্তুর অসারবার্তা নিরূপণ করা। ডিশ স্যাটেলাইটের যুগে প্রতিনিয়ত আমরা অসত্য-অসুন্দরের পথে পা দেওয়ার অনেকগুলো রাস্তা খুঁজে পাই। আত্মবিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজে ঘূর্ণ্যমান অসত্য ও অসুন্দর থেকে সুন্দরকে গ্রহণ করতে হবে। মা সরস্বতীর হাতে বীণা দেখা যায়। এই বীণা কলা এবং সংগীতের প্রতীক। বৈশ্বিক চিন্তার অতল সাগরে পড়ে মানুষ হাবুডুবু খায়। তখন তার একটু মানসিক প্রশান্তি দরকার। এই প্রশান্তি লাভের জন্য তিনি সংগীত শোনেন। বীণাতে যেমন সংগীত বাজে তেমন সৃষ্টি হয় নাদ। যোগশাস্ত্র মতে, এই বীণা মেরুদণ্ডের প্রতীক। সরস্বতীসাধনায় সাধক যখন অনাহত ব্রহ্মানাদ শ্রবণ করেন, তখন সংসারে শত কোলাহল তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া সনাতনি শিক্ষার্থী ভাইবোনদের আন্তরিক প্রচেষ্টার আয়োজন থাকে প্রতিটি পূজামণ্ডপে। প্রকৃত বিদ্যা মানুষকে বিনয় দান করে। বিদ্যাহীন মানুষ অন্ধকারে হাবুডুবু খায়। যে যত বেশি বিদ্বান, সে তত বেশি নিরহংকার, নিরভিমান। সরস্বতী পূজার তাত্ত্বিক রহস্য একজন মানুষকে প্রকৃত বিদ্বান হতে সাহায্য করে। এই পূজার মাধ্যমে আমরা আমাদের ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করে আলোকিত মানুষ হতে পারি।













