আকাশপথের নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা যেইখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হইবার কথা, সেইখানে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস’-এর একশ্রেণির পাইলটের দায়িত্ব অবহেলা আমাদের ভাবাইয়া তুলিয়াছে। সম্প্রতি লন্ডনগামী ফ্লাইটে তাজাম্মুল আলী নামক এক যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং পাইলট কর্তৃক কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশ অমান্য করিবার ঘটনাটি কেবল একটি দুর্ঘটনা মাত্র নহে; বরং ইহা আকাশপথে যাত্রীনিরাপত্তার চরম লঙ্ঘন ও পেশাদারিত্বহীনতার এক দুঃখজনক বহিঃপ্রকাশ।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, মধ্য আকাশে যাত্রী অসুস্থ হইয়া পড়িলে নিকটস্থ লাহোর বিমানবন্দরে অবতরণের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল; কিন্তু পাইলট সেই নির্দেশ উপেক্ষা করিয়া দীর্ঘ তিন ঘণ্টার অধিক সময় ব্যয় করিয়া ঢাকায় ফিরিয়া আসেন। এই বিলম্বিত সিদ্ধান্তের কারণে হতভাগ্য যাত্রী মৃত্যুবরণ করিয়াছেন বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। প্রশ্ন জাগে, সহস্রাধিক ফুট উচ্চতায় যখন একজন মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা দেখা দেয়, তখন ‘অপারেশনস ম্যানুয়াল’ বা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আইন কী করিয়া বৈমানিকদের নিকট তুচ্ছ বলিয়া গণ্য হয়? নিকটস্থ উপযুক্ত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ (ডাইভারশন) করা যেইখানে বাধ্যতামূলক, সেইখানে কোন অদৃশ্য ক্ষমতাবলে পাইলটগণ যাত্রীদের জীবন লইয়া এইরূপ ছিনিমিনি খেলেন তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। আরো উদ্বেগের বিষয় হইল, বাংলাদেশ বিমানের অভ্যন্তরে এই অরাজকতা ও নিয়ম ভঙ্গের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। গত কয়েক বত্সরে একই ধরনের একাধিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে যাহা মোটেও কাম্য নহে।
২০২৩ সালের আগস্টে দাম্মামগামী ফ্লাইটে এবং নভেম্বরে লন্ডনগামী ফ্লাইটে যাত্রীর মৃত্যু ঘটিলেও পাইলটগণ নিকটস্থ বিমানবন্দরে অবতরণ করেন নাই। দুঃখজনক বিষয় হইল, এই সকল গুরুতর অপরাধের শাস্তি তো হয়-ই না, বরং এককালে অভিযুক্ত এমন ব্যক্তিরাও অনেক সময় তদন্ত কমিটির প্রধান হইয়া বসেন। যে ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে সমজাতীয় অবহেলার অভিযোগ ছিল, তাহাকেই বর্তমান ঘটনার তদন্তভার অর্পণ করা হইয়াছে। ইহা কি অপরাধীকে বিচারকের আসনে বসাইয়া ন্যায়বিচারের প্রহসন করিবার নামান্তর নহে? পারিবারিক বা রাজনৈতিক প্রভাবে তদন্ত হইতে রেহাই পাইবার যে সংস্কৃতি বিমানে শিকড় গাড়িয়াছে, তাহাই এই ধারাবাহিক অবহেলার মূল কারণ বলিয়া জানা যায়।
বিমান পরিচালনায় ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) মানিয়া চলা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নহে, বরং তাহা বাধ্যতামূলক। গ্রাউন্ড স্টাফদের দুর্নীতি বা অবহেলার কারণে অসুস্থ যাত্রী বিমানে আরোহণ করা এবং পরবর্তী সময়ে পাইলটের একগুঁয়েমির বলি হওয়ার মতো পরিস্থিতি হইতে আমাদের পরিত্রাণ লাভ করা আবশ্যক। আকাশপথের নিরাপত্তা কোনো দয়াদাক্ষিণ্যের বিষয় নহে, ইহা যাত্রীর অধিকার। আমরা মনে করি, কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করিয়া কালক্ষেপণ করিলে চলিবে না। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিয়ম অনুযায়ী দোষী পাইলটদের যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান করিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তদন্ত প্রক্রিয়া হইতে দূরে রাখিতে হইবে। আকাশপথ যেন একদল দায়িত্বহীন ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার ক্ষেত্র না হয়, তাহা নিশ্চিত করিবার দায়িত্ব সরকারের। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যদি জনমানুষের আস্থা হারায়, তাহা হইলে তাহার দায়ভার কে লইবেন?
আমরা আশা করি, যথাযথ কর্তৃপক্ষ এই চরম অব্যবস্থাপনার অবসান ঘটাইয়া যাত্রীদের জীবন রক্ষায় আরো তত্পর হইবেন। এই ব্যাপারে বিমানে থাকা চিকিত্সকদের আরো দায়িত্বশীলতা কাম্য। এই ক্ষেত্রে ‘ফিট ফর ফ্লাই’ সংক্রান্ত নীতিও মানিয়া চলা জরুরি। কেননা উড়োজাহাজের টেক অফ (উড্ডয়ন) বা ল্যান্ডিংয়ের সময় বায়ুর চাপ পরিবর্তনের ফলে তাহার ধকল অনেক রোগী সহিতে পারেন না। আবার এয়ার প্রেশার একটু কমিয়া গেলেও অনেকে অসুস্থ হইয়া পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের ঝাঁকুনি বা বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হয়। তাই যাত্রার পূর্বে যাত্রীদের অসুস্থতার বিষয়টি যেন কেহ লুকাইতে না পারেন, তাহার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।













