উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতার অন্ত নাই! এই সকল দেশের রাজনীতি হইয়া উঠিয়াছে অনেকটা প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধপরায়ণ। রাজনীতিবিদদের নিকট ইহা এমন ‘একটি ধারাবাহিক খেলা’, যাহা অনুষ্ঠিত বা প্রদর্শিত হইয়া থাকে বিশেষ করিয়া নির্বাচনের সময়। ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ কথাটি এই সকল দেশে বহুল ব্যবহূত। নির্বাচনের নামে এই খেলার নিয়ন্ত্রণ থাকে সর্বদা ক্ষমতাসীনদের হস্তে। ফলে সর্বদা বিরোধী মতাদর্শের লোকজন বেকায়দায় পড়িয়া যায়। তাহাদের জীবনে নামিয়া আসে দুর্যোগের ঘনঘটা। কি পুলিশ-প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র, কি চালকের আসনে থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সকলের মিশন যেন একটাই; উহা হইল, বিরোধী পক্ষকে যে করিয়াই হউক প্রতিরোধ করা, তাহাদের ঘরছাড়া-লক্ষ্মীছাড়া করা, এমনকি মূলোত্পাটন বা নির্মূল করা।
পুলিশ-প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় জেলজুলুম, অত্যাচার-অবিচারের স্টিমরোলার চালাইয়া তাহাদের জীবনকে দুর্বিষহ করিয়া তোলা। এই সকল দেশে নির্বাচন এমন একটি খেলা, অনেক সময় এমনও দেখা যায়, খেলার ময়দানকেই গণ্ডিবদ্ধ করিয়া দেওয়া হয়; বিরোধী পক্ষ গোল দিতে যাইবে, এমন সময় গোলপোস্ট সরাইয়া নেওয়া হয়। এমনকি তাহাদের খেলিতে নামিতেই দেওয়া হয় না। সদম্ভে হুংকার দেওয়া হয় যে, তাহারা ভোটকেন্দ্রের ধারেকাছেও আসিতে পারিবে না! মামলা-হামলার ভয়ে তখন অনেকেই তটস্থ থাকেন। এমন খেলায় সাধারণ দর্শক তথা মানুষ হইয়া উঠেন গিনিপিগ। তবে প্রতিহিংসার এই রাজনীতি দিন শেষে কাহারো জন্যই সুখকর হয় না—বিরোধী পক্ষের মতোই একটি সময়ে আসিয়া ক্ষুদ্র ও একাকী হইয়া পড়ে সম্মুখভাগের খেলোয়াড়রা। কখনো-বা এই খেলার ইতিহাস লিখা হইয়া যায় ‘রক্ত দিয়া’।
উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতির এই রুগ্ণ দশা প্রত্যক্ষ করিয়া বিজ্ঞজনেরা আক্ষেপের সুরে বলিয়া থাকেন, রাজনীতির শুদ্ধতা সহনশীলতায়, তাহা কলুষিত হয় প্রতিহিংসায়। উন্নয়নশীল দেশসমূহে আমরা কী প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি? সেইখানে বিরোধী মতের বা পথের লোক কি রাস্তায় নামিতে পারেন ঠিকমতো? তাহাদের ন্যায্য অধিকারকে কি থোড়াই কেয়ার করার ঘটনা ঘটে? নির্দোষ-নির্লিপ্ত ব্যক্তিকে পর্যন্ত কার্যত গৃহবন্দি করিয়া রাখা হয়। তাহাদের না অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা থাকে, না থাকে মন খুলিয়া কথা বলিবার। অথচ কর্তাবাবুরা মুখে ঠিকই মন খুলিয়া কথা বলিবার আহ্বান জানাইয়া থাকেন। ইহার চাইতে বড় রসিকতা আর কী হইতে পারে?
উন্নয়নশীল দেশসমূহ রাজনৈতিক পট পরিবর্তন কিংবা ভোটের সময় অস্থির থাকিবে—ইহাই যেন ললাটের লিখন। ইহাই স্বাভাবিক প্রবণতা হইয়া দাঁড়াইয়াছে; কিন্তু কেবল একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে টার্গেট করিয়া তাহাদের উপর দমনপীড়ন চালানো হইবে কেন? রাজনৈতিক অঙ্গন একটি উন্মুক্ত খেলার জায়গা, সেইখানে কেন বারংবার পাতানো খেলা হইবে? রাজনীতির খেলার মধ্যে পড়িয়া যদি পরিবারের উপর অনাচার নামিয়া আসে, বিচারহীনতার জাঁতাকলে পড়িয়া যাইতে হয়, তাহা হইলে সেই সমাজে কোনো ভদ্রলোক কি রাজনীতিতে তাহার নাম লিখাইতে চাহিবেন? ইহাতে কি রাজনীতির মান অক্ষুণ্ন থাকিবে? এই কারণে উন্নয়নশীল দেশের উদ্দেশে রসিকতা করিয়া বলা হইয়া থাকে যে, এমন দেশ পরিচালনা ও রক্ষা করেন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। তাহা না হইলে সেই সকল পক্ষপাতদুষ্ট ও বিভক্ত সমাজ বহু পূর্বেই বিলুপ্ত হইয়া যাইত। যখন যাহারা ক্ষমতাসীন থাকেন, রাষ্ট্র ও সমাজের মানুষকে তাহারা নিজেদের হাতের পুতুল জ্ঞান করেন। মতের মিল থাকিলে দেশপ্রেমিক, না থাকিলে দেশদ্রোহী। ইহা রাজনৈতিক আত্মহত্যার নামান্তর বই আর কিছুই নহে।
রাজনীতিতে বহু দল থাকিবে, নানান মত ও মতাদর্শ থাকিবে এবং সেইখানে মতৈক্য না থাকিলেও থাকিবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মানসিকতা; কিন্তু তাহা না করিয়া কেবল বিরোধীদের লাগাম টানিয়া ধরা, তাহাদের নির্মূল করিবার অপচেষ্টা কেন বারংবার চলিবে? ইহার কি কোনো শেষ নাই? জাতীয় ঐক্য গঠন করিবেন এমন কোনো রাষ্ট্রনায়ক কি নাই এই সকল দেশে? রাজনীতি মানে নীতির সেরা বা শ্রেষ্ঠনীতি। এই জন্য প্রতিহিংসা কখনোই রাজনীতির নামান্তর হইতে পারে না। উন্নয়নশীল দেশসমূহ এই কলুষিত ও বিষাদময় সংস্কৃতি হইতে আর কখন বাহির হইয়া আসিবে? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একটা সরকার আসে, আবার যায়; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে সরকার কীভাবে আসে ও কীভাবে যায় ইহা লইয়া বারংবার প্রশ্ন উঠিবে কেন? রাজনীতির এই খেলা আর কতদিন চলিবে?













