পরিবেশের বন্ধু গাছ তথা বন। এটা চিরন্তন সত্য হলেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের দেশে দেশে চলে বন ধ্বংসের মহড়া। বিশ্বখাদ্য সংস্থা, গ্লোবাল ওয়াচ-এর যৌথ গবেষণা অনুযায়ী পৃথিবীর কয়েকটি দেশ সবচেয়ে বেশি বন ধ্বংস করছে। তার মধ্যে ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, আজেন্টিনা, পেরু, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, মাদাগাস্কার উল্লেখযোগ্য।
এর মধ্যে ব্রাজিলের অ্যামাজন রেইনফরেস্টের বড় অংশে কৃষি সম্প্রসারণ, গবাদি পশু খামার, আগুন লাগানো, খননকাজের জন্য বন উজাড় হচ্ছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেইনফরেস্ট (কঙ্গোবেসিন) এ জ্বালানি কাঠ ব্যবহার, কৃষিকাজে ও দারিদ্র্যতায় অভাবি মানুষ জীবিকার জন্য বৃক্ষ নিধন করছে। বলিভিয়ার সান্তা ক্রুজ অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ, গবাদি পশু খামার ও আগুন লাগানোর কারণে বন ধ্বংস হচ্ছে। প্যারাগুয়ে ‘চ্যাকো’ বনভূমির বন উজাড় এবং গবাদিপশু খামারের জন্য বন ধ্বংস হচ্ছে। আর্জেন্টিনায় গ্র্যান চাকো অঞ্চলে কৃষি ও সয়াবিন চাষের জন্য বন হারাচ্ছে। পেরুতে কোকা চাষ ও কৃষি সম্প্রসারণে বন উজাড় হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় পাম অয়েল শিল্পের জন্য বন ও বন্য প্রাণীর আবাস ধ্বংস হচ্ছে। মিয়ানমারে টেকের কাঠ রপ্তানি, অবৈধ লগিংয়ের ফলে বন ধ্বংস হচ্ছে। নাইজেরিয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি, জ্বালানির প্রয়োজনে বন উজাড় হচ্ছে, ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ বন ধ্বংস হয়েছে। মাদাগাস্কারে কৃষি, জ্বালানি কাঠ ও বনে আগুন অব্যাহত থাকায় অনন্য প্রাণবৈচিত্র্য ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্যামেরুনে কৃষি সম্প্রসারণ এবং অবৈধ কাঠ পাচারে বন কমছে।
লেসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর হাইকো বালস্টার, ড. নেজা আসিলসহ একদল তরুণ সহকর্মীর গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী আফ্রিকার বন এখন আর কার্বন শোষণ করছে না বরং কার্বন নিঃসারণ করছে। ২০১০ সালের পর ঘটে যাওয়া এই উদ্বেগজনক পরিবর্তন বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের বন রক্ষায় আরো শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্বকে জোরালো করেছে। এটা ব্রাজিলে সদ্যসমাপ্ত কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। উন্নত স্যাটেলাইট ডেটা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা গাছপালায় সঞ্চিত কার্বনের পরিমাণ অর্থাত্ ‘অ্যাবাভগ্রাউন্ড বায়োমাস’ ২০০৭ থেকে এক দশকের বেশি সময় ধরে অনুসরণ করেন। ২০০৭-২০১০ সালের মধ্যে আফ্রিকা কার্বন অর্জন করলেও পরে ব্যাপক বন নাশের কারণে এই প্রবণতা উলটে যায়।
২০১০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আফ্রিকা প্রতি বছর প্রায় ১০৬ বিলিয়ন কিলোগ্রাম বন হারিয়েছে, যা প্রায় ১০৬ মিলিয়ন গাড়ির সমান ওজন। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, মাদাগাস্কার ও পশ্চিম আফ্রিকার কিছু দেশে ক্রান্তীয় আর্দ্র চওড়া পাতার বন ব্যাপক হারে ধ্বংস হয়েছে। সাভানা অঞ্চলে ঝোপ বাড়লেও তা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেনি। লেসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল ফিউচারের পরিচালক ও গবেষক প্রফেসর হাইকো বালস্টারের মতে, ‘এটি বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির জন্য এক গুরুতর সতর্কবার্তা। আফ্রিকার বন যদি আর কার্বন শোষণ না করে, তবে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য ধরে রাখতে অন্যান্য অঞ্চলকে আরো বেশি নিঃসারণ কমাতে হবে। বৈশ্বিক বন নাশ বন্ধ করতে ‘ট্রপিকাল ফরেস্টস ফরএভার’ তহবিলে দ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো দরকার। এ কারণে কপ-৩০ প্রেসিডেন্সি ‘ট্রপিকাল ফরেস্ট ফর এভার ফ্যাসিলিটি’ ঘোষণা করেছেন। যার লক্ষ্য বন সমৃদ্ধ দেশগুলোকে তাদের বন অক্ষত রাখতে অর্থ সহায়তা দেওয়া। কিন্তু গবেষণা জানাচ্ছে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক কার্বন বাফার হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পৃথিবীর দেশে দেশে বন ধ্বংসের কারণ প্রায় অভিন্ন হলেও বন রক্ষায় উদাসীনতায় ভাবিয়ে তুলছে মানুষকে। আগে আফ্রিকার বন প্রতি বছর লাখ লাখ টন কার্বন শোষণ করত। এখন শোষণ কমে যাওয়ার মানে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরো ত্বরান্বিত হবে। তখন প্যারিস চুক্তির কার্বন নিঃসারণ ১.৫ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, মাদাগাস্কার, নাইজেরিয়া, ঘানা, ক্যামেরুন প্রভৃতি। জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাসে, কার্বন শোষণে বনকে জলবায়ু নীতির জন্য ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে বলা হয় ঐ গবেষণায়। আশঙ্কা হচ্ছে আফ্রিকার বন যদি স্থায়ীভাবে কার্বন উেস পরিণত হয়, তবে বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন এটি শুধু আফ্রিকার সমস্যা নয়, এটি পৃথিবীর কার্বন ভারসাম্য পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সংকেতগুলোর একটি। বন রক্ষায় আরো শক্ত উদ্যোগের আহ্বান লেসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নেজা আসিলের। তার পরামর্শ—বন রক্ষায় ‘বন শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অবৈধ কাঠ কাটার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকা অঞ্চলে ১০ কোটি হেক্টর ভূমি পুনরুদ্ধার করা গেলে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখরে।’
অবশ্য বাংলাদেশ প্রসঙ্গে গবেষণায় কিছু উল্লেখ করা হয়নি। তবুও বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ, জলপ্রবাহ বিশিষ্ট ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ। এই ঝুঁকি হ্রাসে ২০-২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা উচিত। সরকারি হিসেবে দেশে বনভূমির পরিমাণ রয়েছে ১২.৮ শতাংশ। বাস্তবে এই পরিমাণ আরো কম। এমনি অবস্থায় সংরক্ষিত বন বাড়ানোর পাশাপাশি শহর-গ্রাম সর্বত্র বৃক্ষরোপণ, গ্রিন করিডর সৃষ্টি, নদী তীর, চরাঞ্চল ও উন্মুক্ত স্থানে বৃক্ষরোপণকে গুরুত্ব দিতে হবে।













