ডিজিটাল প্রযুক্তি বর্তমানে আধুনিক রাষ্ট্রের এক অনিবার্য অবলম্বন। নাগরিক সেবা সহজ করা, সময় ও ব্যয় সাশ্রয় করা, দুর্নীতির সুযোগ কমানো— এই সকল যুক্তির ওপর দাঁড়িয়েই বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশও এই পথ অনুসরণ করেছে। ই-গভর্ন্যান্স, মাইগভ প্ল্যাটফরম, ই-অ্যাপোস্টিল— এই সকল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করে; কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সম্প্রতি ই-অ্যাপোস্টিল সেবার আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট নির্মাণ করে অন্তত এক হাজার একশ নাগরিকের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত নথি ফাঁস হয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধ নয়— এটা রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তাকাঠামোর এক গভীর দুর্বলতাও বটে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিয়ের সনদ, শিক্ষাসনদ, ব্যাবসায়িক চুক্তিপত্র— এই সকল নথি কোনো সাধারণ তথ্য নয়। এটা ব্যক্তির পরিচয়, মর্যাদা ও নিরাপত্তার ভিত্তি। একবার এই তথ্য ফাঁস হলে তা আর ‘পাসওয়ার্ড’-এর মতো পরিবর্তনযোগ্য থাকে না— আজীবনের জন্যই সেটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
সরকারি বক্তব্যে একে ‘স্যাবোটাজ’ বলা হচ্ছে। সন্দেহ নেই, পরিকল্পিতভাবে সরকারি সেবার ছদ্মবেশে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা একটি গুরুতর অপরাধ; কিন্তু প্রশ্ন হলো —এই অপরাধ ঘটার সুযোগ কেন তৈরি হলো? কেন সরকারি সেবার মতো দেখতে এমন ছয়টি ভুয়া ডোমেইন দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারল? একজন সাধারণ নাগরিক ডট বিডি ও ডট নিউজ ডোমেইনের পার্থক্য না-ই বুঝতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া সাইট যারা তৈরি করে, তাদের আটকানোর দায়িত্ব তো রাষ্ট্রেরই। কারণ, নকল ওয়েবসাইট রাষ্ট্রীয় সাইটের আদলে হওয়ার কারণে অপরাধীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরির সুযোগ পায়।
মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স মানে কেবল সেবা অনলাইনে লইয়া যাওয়া নয়— এর অপরিহার্য শর্ত হলো নিরাপত্তা, সচেতনতা ও জবাবদিহি। উন্নত রাষ্ট্রসমূহে সরকারি ডিজিটাল সেবার সাথে শক্তিশালী অথেন্টিকেশন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ভুয়া সাইট শনাক্তকরণ এবং নাগরিকদের জন্য স্পষ্ট ও ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারণা যুক্ত থাকে। আমাদের দেশে সেই প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট। সাধারণ মানুষ এখনো জানে না— সরকারি সেবায় কোন ঠিকানা নিরাপদ, কোনটি সন্দেহজনক। মধ্যস্থতাকারী বা দোকানের ওপর নির্ভরশীলতা এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এখানে আরেকটি গুরুতর দিক লক্ষণীয়। ভুয়া ওয়েবসাইটে ধারাবাহিক নম্বর পরিবর্তন করলেই অন্য নাগরিকের নথি দেখা যাচ্ছে— যা সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় ‘ইনসিকিউর ডিরেক্ট অবজেক্ট রেফারেন্স’। এই ত্রুটি কোনো জটিল রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র নয়— এটা মৌলিক নিরাপত্তা নকশার ব্যর্থতা। যদি এলোমেলো ও ইউনিক আইডেন্টিফায়ার ব্যবহৃত হতো, যদি ন্যূনতম পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা থাকত— তাহলে এই বিপর্যয় অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য হতো। দুঃখজনকভাবে, এটাই প্রথম ঘটনা নহে। ‘সুরক্ষা’ প্ল্যাটফরমে সংরক্ষিত কোটি কোটি নাগরিকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রির অভিযোগ এখনো মানুষের স্মৃতিতে তাজা।
ডিজিটাল রূপান্তরের এই পর্যায়ে রাষ্ট্রকে তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তথ্য সুরক্ষা আইন ও তার কঠোর প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, সরকারি ডিজিটাল সেবার নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার স্বাধীন ও নিয়মিত অডিট। তৃতীয়ত, নাগরিক সচেতনতা— সরকারি সেবা মানে কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়, বরং নির্ভরযোগ্য একটি চিহ্ন, যা সহজে যাচাইযোগ্য হবে।
বস্তুত, ডিজিটাল রাষ্ট্রের মূল আস্থার জায়গাটি হলো— নাগরিক তার তথ্য দেবে, আর রাষ্ট্র সেই তথ্য আগলাইয়া রাখবে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের তথ্য রক্ষা করতে না পারে, তাহলে ডিজিটাল রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি হবে কী করে? বিশেষত, নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বহু গুণ বেশি। বিবাহর সনদ, পরিচয়পত্র বা ঠিকানাসংক্রান্ত তথ্য অপব্যবহার হলে সামাজিক, মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অপরাধ ঘটার পর তদন্ত করে চিঠি পাঠানো নয়— দায়িত্ব হলো, এমন ব্যবস্থা গড়া, যেখানে অপরাধ ঘটানোই কঠিন হয়ে পড়ে।













