সড়ক দুর্ঘটনা এ দেশে নিয়মিত দৃশ্য। হররোজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়কে হতাহত স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, বলতে হয় রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৩০০ ফিট সড়কের কথা। রাত-দিন হাজারো যানবাহনের শব্দে মুখরিত এই সড়ক যেন দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হয়ে উঠছে। প্রায় প্রতিদিনই এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে, আর তাতে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ; অনেকে চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু কে শোনে কার কথা!
অভিযোগ আছে, এই সড়কে একশ্রেণির উঠতি বয়সি তরুণ ‘বাইক কম্পিটিশনে’ মেতে ওঠে। গভীর রাতে রীতিমতো প্রতিযোগিতার আসর বসে—কে কত জোরে বাইক বা প্রাইভেট কার ছোটাতে পারে। এ কী অসুস্থ প্রতিযোগিতা! শুধু তা-ই নয়, এতে আবার থাকে পুরস্কারের ব্যবস্থা! নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে গাড়ি হাঁকিয়ে প্রথম বা দ্বিতীয় হতে পারলেই থাকে বিশেষ গিফট বা ট্রিট। অসুস্থ সংস্কৃতির চূড়ান্ত নমুনা বটে।
পত্রপত্রিকার খবরে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় এসব নিয়ে। তাদের দাবি, এই সড়কে গাড়ি চালানোর সময় একশ্রেণির চালকের যেন হুঁশ থাকে না! তাদের গাড়ির স্পিড এতটাই বেশি থাকে যে, বেপরোয়া গতির মুখে হর্ন, ব্রেক কিছুই কাজ করে না! কেউ তো আবার এক ধাপ এগিয়ে ব্যবহার করে উচ্চশব্দের হাউড্রোলিক হর্ন। এসবই ৩০০ ফিট সড়কের চিরচেনা দৃশ্য হয়ে উঠছে। আর এসব যেন নজরদারির বাইরে!
৩০০ ফিট সড়কটি সোজা ও প্রশস্ত হওয়ায় চালকরা দুরন্ত গতিতে ছুটে চলার প্রয়াস পায়। এখানে নেই কার্যকর স্পিড ব্রেকার কিংবা মনিটরিং ক্যামেরার মতো যুতসই কোনো ব্যবস্থা। পুরো সড়ক জুড়ে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাও থাকেন হাতে গোনা। সড়কটি পারাপারের জন্য ফুট ওভারব্রিজ নেই; জেব্রা ক্রসিং-ও খুবই সীমিত। এর বিপরীতে বরং রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ইউ-টার্ন ও ক্রসিং, যার ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীকে দৌড়ে সড়ক পার হতে হয়। এতে করে দ্রুতগতির যানবাহন হঠাৎ করে সামনে এসে পড়া গাড়ি বা পথচারীর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। এ সড়কে ‘হিট অ্যান্ড রান’ কেস ক্রমশ বাড়ছে।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০০ ফিট সড়কটি মূলত একটি হাই-স্পিড আঞ্চলিক হাইওয়ে, কিন্তু বর্তমানে এটি মিক্সড ট্রাফিক জোনে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের সড়কে স্পিড কন্ট্রোল, ফুটপাত, ওভারব্রিজ ও ইউ-টার্ন পরিকল্পনা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক। সুতরাং প্রশ্ন থেকে যায়, এভাবে কতকাল চলবে? এ থেকে কি উত্তরণের কোনোই পথ নেই? এসব নিয়ে স্থানীয়রা আক্ষেপ করে অভিযোগ তুললেও তা যেন সংশ্লিষ্টদের কর্ণকুহর পর্যন্ত পৌঁছায় না—এ কেমন কথা?
মনে রাখা দরকার, ৩০০ ফিট সড়ক আমাদের একটি মেগা প্রজেক্ট, যা নিয়ে গর্ববোধ করতেই হয়। এটা শুধু সড়ক বা রাস্তা নয়, বরং হাজারো মানুষের দৈনন্দিন কর্মজীবন, শিক্ষা, চিকিত্সা ও পরিবহনের প্রধান ধমনি। অথচ সেই সড়কটি হয়ে উঠছে আতঙ্কের কারণ। মানুষ জীবন হাতে নিয়ে এ পথে চলাচল করছে সময়ের প্রয়োজনে। সঠিক পরিকল্পনা ও কর্তৃপক্ষের সুমতি এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল এ সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হতে পারে। চলতি শীত মৌসুমে কুয়াশাচ্ছন্ন বিরূপ পরিবেশের কথা মাথায় রেখে বিষয়টি আমলে না নিলে ৩০০ ফিট সড়ক যে প্রতিদিনই রক্তে লাল হতে থাকবে, সে কথা বলাই বাহুল্য।













