একটি জাতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে, সেই জাতির ভাঙন অনিবার্য; কিন্তু যাদের নৈতিকতা দৃঢ়, যাদের সততা ও দায়িত্ববোধ সমাজ জুড়ে প্রতিষ্ঠিত, তাদের পরাজিত করা যায় না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো জাপান। অর্থনৈতিক শক্তিতেই শুধু নয়, বরং নৈতিকতার শক্তিতেও—সততা, শৃঙ্খলা, বিনয় ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা—এই চার স্তম্ভেই দাঁড়িয়ে আছে দেশটির সমাজব্যবস্থা।
জাপানের মানুষ মাথা নোয়ায়, কিন্তু তা দুর্বলতার প্রতীক নয়, বরং তা তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক। শিশুকাল থেকে শুরু করে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মজীবনব্যাপী তারা শেখে শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ ও সততার পাঠ। সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষ মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারাকে জীবনের সার্থকতা বলে মনে করে। বিনয় সেখানে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমি দীর্ঘ সময় জাপানে ছিলাম। আমার উচ্চশিক্ষার সব ব্যয় বহন করেছিল জাপান সরকার। কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকালীন আমি প্রত্যক্ষ করেছি, কীভাবে সততা ও আন্তরিকতা জাপানিদের জীবনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
একবার ফুকুওকা শহরে অফিসের ফোন বুথের পাশে ভুলবশত মানিব্যাগ রেখে চলে আসি। ঘণ্টাদুয়েক পরে মনে পড়লে ফিরে গিয়ে দেখি, মানিব্যাগটি ঠিক আগের জায়গাতেই রয়েছে, ভেতরের একটি ইয়েনও কেউ স্পর্শ করেনি। এটি জাপানি সততার এক ক্ষুদ্র, কিন্তু গভীর উদাহরণ।
আরেকবার ট্রেনে যাত্রাকালে একটা মানিব্যাগ চোখে পড়লে পাশের আসনে বসা এক বৃদ্ধা মহিলার মানিব্যাগ মনে করে আমি সেটি তুলে দিতে চাইলে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেটি তার নয় বলে আমাকে জানিয়ে ধন্যবাদ দেন এবং স্টেশনে নেমে সেটি স্টেশন অফিসে জমা দিতে বলেন। পরে জেনেছি, জাপানে কেউ যদি রাস্তায় টাকা, মানিব্যাগ বা মূল্যবান বস্তু পায়, তারা সাধারণত পুলিশ স্টেশনে জমা দেয়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, টোকিও শহরে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ হারানো জিনিস পুলিশের কাছে জমা পড়ে, যার ৭৫ শতাংশেরও বেশি প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরে যায়। এটা কেবল আইন নয়, এটা তাদের বিবেকের দায়।
জাপানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থানও অনুকরণীয়। সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি দুর্নীতির অভিযোগে ধরা পড়লে তিনি আদালতের রায় আসার আগেই পদত্যাগ করেন; কখনো কখনো আত্মহত্যা করেন লজ্জা ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে। সরকারি অফিসে উপহার গ্রহণ, বিশেষ সুবিধা নেওয়া, তথা ‘ঘুষ’—এই ধারণাগুলো সে সমাজে বিলুপ্ত প্রায়। জাপানের সাধারণ কর্মচারী থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত—সবাই জানেন, সততা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড।
গবেষণাগারে কাজ করার সময়ও আমি জাপানিজদের মানবিকতা অনুভব করেছি। আমি ছিলাম এক বিদেশি ছাত্র, তবু সহপাঠী ও অধ্যাপকদের সহযোগিতা আমাকে কখনো একাকিত্ব অনুভব করতে দেয়নি। তাদের কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সময়নিষ্ঠা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা আমার জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো আজ আমাকে বাংলাদেশের বাস্তবতার কথা ভাবায়। আমাদের সমাজেও একসময় সততা, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা ছিল। অথচ এখন আমরা দেখি, হানাহানি, অপমান, দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ এবং একে অন্যের প্রতি অসম্মান। যেন সমাজের মেরুদণ্ডটাই ভেঙে পড়েছে! দিনকে দিন আমরা ভুলে যাচ্ছি, একটি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হলে প্রয়োজন নৈতিক দৃঢ়তা। ক্ষমতা নয়, সততাই একটি জাতির প্রকৃত শক্তি।
প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করি, আমাদের সন্তানদের আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি? যদি তারা এটা দেখে বেড়ে ওঠে যে, সমাজে মিথ্যা, ঘুষ, অন্যায় আর অনৈতিকতার জয়জয়কার, তাহলে তারাও সেই চক্রে আটকে পড়বে। অথচ পরিবর্তনের শুরুটা আমাদের হাতেই। পরিবার থেকে বিদ্যালয়, বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র—প্রত্যেক স্তরে আমরা যদি তাদের সততা, শিষ্টাচার ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে আমরাও একদিন সত্, সভ্য, ন্যায়নিষ্ঠ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাব।
জাপানের একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হলো, ‘সততা এমন আলো, যা নিজে জ্বলে এবং অন্যকেও জ্বালায়’। আমাদের সমাজেও সেই আলো জ্বলে উঠুক—কামনা এটাই।













