বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। এখন প্রায় সব কিছুই প্রযুক্তি-নির্ভর। শহর থেকে গ্রাম, বড় থেকে ছোট্ট সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই প্রযুক্তির ব্যবহার ক’জন জানে? শহর আগেই আধুনিকায়ন হওয়ায় শহরের মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানে। কিন্তু গ্রামের মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও যথোপযুক্ত ব্যবহার ক’জনে জানে! বেশির ভাগই এ বিষয়ে অজ্ঞ। যার কারণে গ্রামের মানুষের কাছে প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে অপব্যবহারই বেশি হয়। যার প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে গ্রামের যুবসমাজের কাছে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে।
বর্তমান এক ভয়াবহ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। যাকে বলা যায় অসুস্থ প্রজন্ম। যারা কায়িক শ্রমে নেই, বিকাল হলে মাঠে খেলতে যায় না, বাবা-মায়ের কথা শোনে না, পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত, নিজের উন্নতির কথা ভাবে না, সমাজ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না, সমাজে মানুষ নিয়ে ভাবে না, ধর্মপালন থেকে দূরে, নৈতিকতা থেকে দূরে, বড়দের সম্মান করে না, অন্যের বিপদে সাহায্য করে না। সর্বোপরি, এ যেন এক ভয়াবহ প্রজন্ম।
এখন গ্রামীণ খেলাধুলা বিলুপ্তির পথে। এগুলো আদৌ কি ফিরতে পারবে! সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা যত দিন যাচ্ছে ততই অবনতি বাড়ছে। যা বিলুপ্ত হয় তা পুনরায় জাগিয়ে তোলা সহজ নয়। কত খেলাই আগে প্রচলিত ছিল! প্রাইমারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্কুল শেষ করে বিকাল হলেই বিভিন্ন খেলায় মেতে উঠতো। উচ্চ বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরাও বিকাল হলেই মাঠে আসতো। প্রতিনিয়ত মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা তো হতোই। এর পাশাপাশি হাডুডু বা কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, লুকোচুরি ইত্যাদি হরেক রকমের খেলা প্রচলিত ছিল। হয়তো এসব অনেক খেলার নামই এই প্রজন্ম জানেনা বা জানবে না কখনো। বর্তমানে এসব খেলাধুলার কোনোটিই প্রতিনিয়ত দেখা যায় না। দেখা গেলেও খুবই কম।
আগে গ্রামের একটা অন্যরকম সৌন্দর্য ছিল। সকাল হলেই মসজিদের মক্তব থেকে বাচ্চাদের কুরআন পড়ার গুনগুন আওয়াজ শোনা যেত। আবার মায়েরা বাড়িতে ফজরের নামাজ পড়ে কুরআন পড়তো। কিন্তু এসব এখন বিলুপ্ত। এখন গ্রামে মক্তবও দেখা যায় না, মায়েরাও কুরআন পড়ে না। এখন মানুষের ধার্মিকতা কেবল ওপরে প্রকাশ পায়, কিন্তু ভিতরে শূন্য। এখন মানুষ ছোটে আর ছোটে, কোনো এক অজানা উদ্দেশ্যে! কিন্তু এই প্রজন্ম মাঠে খেলতে যায় না; তারা মোবাইল গেমে আসক্ত। অবশ্য এর জন্য অনেকটা অবিভাবকরাই দায়ী।
যে শিশুটি সবে বুঝতে শুরু করছে, তার হাতেও ফোন দেয়। এখন ছোট্ট বাচ্চারা কান্না করলে বা ভাত না খেলে ফোন দিয়ে চুপ করায়। যার ফলে বাচ্চারা ছোট্ট থেকেই ফোনে আসক্ত। বড় হলে আর ছাড়তে পারে না। আবার মাঝে মাঝে বড় ফোন কিনে না দেওয়ার কারণে আত্মহত্যার খবরও শোনা যায়। এরা এতোটাই ফোনে আসক্ত যে, অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসতই যেন পায় না। না পারিবারিক কাজে, না বাবা-মায়ের কাজে, না ঠিক মতো পড়াশোনা করে, না ধর্ম পালন করে; তারা না নিজেকে নিয়ে ভাবে, না সমাজ নিয়ে ভাবে। এরা শুধুই ফোনে আসক্ত।
মোবাইলে গেম খেলা ছাড়াও রয়েছে ফেসবুকিং, টিকটিক। টিকটিক দিনদিন মানুষকে অমানুষে পরিণত করছে। সামান্য লাইক, কমেন্ট বা ভিউ বাড়ানোর জন্য মানুষ কেবল নিম্ন থেকে নিম্ন স্তরের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। নিজেরই কোনো ধারণা নেই যে, সে কোন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে দিনকে দিন! টিকটক মানুষকে দিনদিন বিকারগস্ত করে তুলছে। মেধার বিকাশকে করছে বাধাগ্রস্ত।
এছাড়া রাত জেগে ফেসবুক চালানো। এই প্রজন্ম রাতে ঘুমাতে অভ্যস্ত নয়। তারা সারারাত জেগে ফেসবুক, মেসেঞ্জারে সময় নষ্ট করে। এরপর ভোরের দিকে ঘুমায়। পড়াশোনা বলতে কিছু নেই। এভাবে দিনের পর দিন মেধাহীন হয়ে যাচ্ছে তারা, কিন্তু সেদিকে কোনোই খেয়াল নেই।
এই প্রজন্মের বেশিরভাগই সাঁতার জানে না। অথচ আগে গ্রামের প্রায় সবাই সাঁতার জানতো। বর্তমান প্রজন্ম পুকুর বা নদীতে যাওয়ার সময় পায় না। শখ করেও যায় না।
আবার দেখা যায় অনলাইন জুয়া আর এর থেকে মাদকাসক্তি। বুঝে না বুঝে অনেকেই অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে গেছে। যার প্রভাব পড়ছে পরিবারের উপর, সমাজের উপর। পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এই প্রজন্ম সময়ের মূল্য বলতে বোঝে মোবাইল চালানো, কে কত সময় পারে মোবাইল চালাতে। কোনো নিয়মকানুন মেনে চলে না। আগে দেখা যেত যে, যেখানেই থাকুক, সন্ধ্যা হলেই ঘরে ফিরে পড়তে বসতো। বাইরে অযথা সময় নষ্ট করতো না। কিন্তু এখন তার উল্টো চিত্র দেখা যায়।
প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণেই গ্রামের যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। এভাবে তৈরি হচ্ছে এক অসুস্থ প্রজন্ম। যে মাঠে আগের প্রজন্ম খেলাধুলা করতো, সেই মাঠে এই প্রজন্ম টিকটিক করে, বসে ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইল গেম খেলে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার চালায় এবং যার সর্বশেষ অবস্থা মাদকের দিকে ধাবিত হওয়া এবং বিচিত্র সব ক্রাইমে জড়িয়ে পড়া।
এহেন অবস্থার কারণে একদিকে যেমন প্রযুক্তির অপব্যবহার দায়ী, তেমনি দায়ী অসচেতন অবিভাবক। এই অবস্থার উত্তরণ খুবই জরুরি। তা না হলে যুবসমাজের পতন অনিবার্য।
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













