শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের প্রায় সব সেক্টরেই কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা এর অধিকাংশকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে এর প্রভাব পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং সেখানে কর্মকর্তারা পুরোনোকেই ধারণ করে আছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেছনে যাত্রা করছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সরকারের দিক থেকে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকে বিটিভি বের হতে পারছে না। ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন ব্যক্তি। এ ছাড়া প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আছে কিছু অদক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতাও। কর্তৃপক্ষ বলছেন, পরিবর্তনের জন্য সময় লাগবে। দর্শক বলছেন, বিটিভি ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’ থেকে ‘বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলন’ তকমা পেয়েছে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব সরকারই বিটিভিকে নিজেদের প্রচারযন্ত্র বানিয়েছে। বিটিভির সংবাদ কখনোই সরকারি প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাব প্রচার করতে পারেনি। বার্তাকক্ষের একটি বড় অংশের নিয়োগ ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়।
বিটিভি দৈনিক ৯টি খবর বুলেটিন প্রচার করে, বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে চারটি বুলেটিন ৩০ মিনিট করে। বাকিগুলো সংক্ষিপ্ত বুলেটিন। এর মধ্যে ‘দেশ ও জনপদের সংবাদ’ এক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। এক যুগ ধরে দেশের সব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বাধ্যতামূলকভাবে বিটিভির বেলা ২টার সংবাদ সম্প্রচার করতে হয়েছে। অবশ্য এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হয়েছে গত ১৮ সেপ্টেম্বর। বিটিভির বার্তাকক্ষে ৪৫ জন প্রতিবেদক ও ৩৭ জন উপস্থাপকসহ সংবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছেন প্রায় ২০০ জন; কিন্তু একেকটি বেসরকারি সংবাদ চ্যানেলে সংবাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন ১২০ থেকে ১৩০ জন।
গণসংযোগের জন্য সরকারি ইলেকট্রনিক মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশে টেলিভিশনের দায়িত্ব ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিটিভি সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কর্মসম্পাদন করে। পরিবর্তনের পর সরকার ও গণমাধ্যমের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। মানুষ এখন জানতে চায়, দেশ পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রসংস্কারে সরকার কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর ভূমিকা কেমন। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, অনিয়ম, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণ এবং এতদিবষয়ক অপরাধ দমনে আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে সরকারের দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড গণমাধ্যমে দেখতে চায়।
শুধু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান সম্প্রচারই বিটিভির লক্ষ্য নয়, জনগণের রুচি তৈরি করাও এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। এই নীতি থেকে বিটিভি সরে গেছে। এই বাস্তবতায় বিটিভি ও বেতারের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে সরকার কমিটি গঠন করেছে। কমিটি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের পথরেখা তৈরিতে কাজ করবে, এর পাশাপাশি টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমের গত ১৫ বছরের নীতিমালা পর্যালোচনা ও ভবিষ্যতের নীতি প্রণয়নে কাজ করবে।
১৯৯০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিব মুজিবুল হকের নেতৃত্বে সম্প্রচার কমিশন গঠিত হয়। কমিশন ১৯৯১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই কমিশনের সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সাবেক সচিব আসাফউদ্দৌলাহর নেতৃত্বে বিটিভি ও বেতারের স্বায়ত্তশাসন নীতি প্রণয়নের জন্য কমিশন গঠন করে। আসাফউদ্দৌলাহ কমিশন ১৯৯৭ সালের ৩০ জুন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, যার পরিণতি হয় মুজিবুল হক কমিশনের মতোই। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ শেষের কিছু আগে ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আইন’ সংসদে পাশ করেছিল; কিন্তু ঐ সরকার সেই আইনের প্রজ্ঞাপন জারি করেনি।
১৯৬৪ সাল থেকে বিটিভি চলছে, কোনো দিন টাকা দিয়ে খেলা কিনতে হয়নি। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে বিনা মূল্যে স্বত্ব নিয়ে খেলা সম্প্রচার করে বিটিভি যথাক্রমে সাড়ে ৪ কোটি ও পৌনে ৮ কোটি টাকা আয় করে। অথচ ২০২২ সালে ৯৮ কোটি টাকা দিয়ে খেলা কিনে বিটিভি আয় করে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে আড়াই কোটি টাকা আবার সরকারি বিজ্ঞাপন।
গত বছর ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর একযোগে বিটিভির সব জেলা সংবাদ প্রতিনিধির নিয়োজন বাতিল করা হয়। ৫ নভেম্বর বিটিভির উপমহাপরিচালক (বার্তা) ড. সৈয়দা তাসমিনা আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশনে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে’। বিজ্ঞপ্তি প্রচারের কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক জন জেলা প্রতিনিধি হাইকোর্টে রিট করলে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব জেলা থেকে রিট হয়নি, সেখানে নিয়োগ বন্ধ থাকবে কেন? তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ও তাদের আইন শাখা এ ব্যাপারে কিছু জানে না। ২০১৬ সালে সরকার অনুমোদিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি নিয়োজন নীতিমালার ৪.৩ ধারায় বলা হয়েছে— ‘জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে হবে। জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালন শেষে সরকারের কাছে কোনো সুযোগসুবিধা দাবি করতে পারবেন না। তাছাড়া, দায়িত্বপ্রাপ্তি বা অব্যাহতির বিষয়ে কোনো আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন না।’ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিশ্চয়ই জানেন! কিন্তু অদ্যাবধি এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে কি জাদুঘরে রূপান্তরিত হবে বিটিভি ভবন!













