জিপিএ-৫ না পেলে জীবন ব্যর্থ, ক্লাসে ফার্স্ট না হলে কিছুই হবে না, সোনায় মোড়ানো এ+ পেলে তবেই উজ্জ্বল হবে মুখ—এমন অসংখ্য কথা আমাদের শিক্ষার্থীদের মুখে শোনা যায়। একসময় এসব ছিল শুধু অভিভাবকদের উদ্বেগের প্রকাশ, কিন্তু আজ তা পরিণত হয়েছে মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাস হ্রাস এবং হতাশার মূল উেস। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘জিপিএ-৫’-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিষাক্ত প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি, যা শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশকে ব্যাহত করছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে এই ধারা চলে আসছে যুগের পর যুগ। বিভিন্ন সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে মুখে নানা কথা বললেও শিক্ষায় অসুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি বন্ধ হয়না। এহেন অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং এই ‘সংকট’ উত্তরণ সম্পর্কে ধারণা পেতে নিচের আলোচনার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া জরুরি—
ফলাফলের মোহ ও প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু
একজন শিক্ষার্থীকে এখন কেবল ভালো ফল করলেই চলে না, তাকে হতে হয় সেরাদের সেরা। কে কত নম্বর পেল, জিপিএ-৫ না ৪.৯৫— এ ধরনের তুলনামূলক আলোচনা শিক্ষাব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, শিক্ষার্থীরা নিজের অগ্রগতির চেয়ে অন্যকে পেছনে ফেলাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে অল্প বয়সেই তারা ভুগছে উদ্বেগ, হতাশা আর আত্মবিশ্বাসের সংকটে।
মানসিক স্বাস্থ্যের উপেক্ষিত অধ্যায়
বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এর পেছনে বড় একটি কারণ—শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত চাপ। পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে প্রতি বছরই আমরা হারাই বেশ কিছু মেধাবী প্রাণ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় হূদয়বিদারক সেসব খবর। অথচ এই বয়সে তাদের মানসিকভাবে শক্তিশালী ও প্রফুল্ল রাখার কথা ভাবা উচিত ছিল। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, নেই মানসিক স্বাস্থ্যসুরক্ষার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা।
পরিবার ও শিক্ষকদের অতি-প্রত্যাশা
বাংলাদেশের অনেক পরিবারেই সন্তানের সাফল্য পরিমাপ করা হয় শুধু পরীক্ষার গ্রেড বা নম্বর দিয়ে। শিক্ষার্থীর নিজের ইচ্ছা, দক্ষতা বা আগ্রহের কোনো মূল্যই থাকে না। বাবা-মা চান সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিসিএস ক্যাডার হোক। এসবই যেন এখন সফল জীবনের একমাত্র মাপকাঠি। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সমাজের গতানুগতিক ধারায় চলতে বাধ্য হয়। শিক্ষকরাও অনেক সময় পরীক্ষার নম্বরকেই একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে মনে করেন। ক্লাসে সৃজনশীলতা বা জিজ্ঞাসু মননকে উত্সাহিত না করে, শুধু মুখস্থ করা বিদ্যাকেই পুরস্কৃত করা হয়।
কোচিং-নির্ভরতা ও বাণিজ্যিকীকরণ
জিপিএ-৫-এর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনির ব্যবসাকে আরো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলেছে। এখন পড়াশোনা মানেই গাইড বই আর কোচিং সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি। ফলে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, শখ পূরণ প্রভৃতি হয়ে যায় গৌণ। অনেকেই এই চাপ সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
শিক্ষা কি শুধুই নম্বরের খেলা?
প্রকৃত শিক্ষা মানে শুধু পাঠ্যবইয়ে ভালো নম্বর পাওয়া নয়। বরং শিক্ষা হলো চিন্তা করার ক্ষমতা, বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়। কিন্তু আমাদের মূল্যায়নপদ্ধতি এখনো মুখস্থনির্ভর। ‘জিপিএ-৫ পেলেই সব ঠিক’— এই ধারণা শিক্ষার্থীদের শিখতে উত্সাহিত না করে শুধু মুখস্থ করতে প্ররোচিত করছে।
কীভাবে আসবে পরিবর্তন?
এই অসুস্থ সংস্কৃতি থেকে বের হতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তানের স্বপ্ন, মানসিক সুস্থতা ও ব্যক্তিত্ব গঠন নম্বরের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকদেরও উচিত, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তা ও ব্যক্তিগত বিকাশে উত্সাহ দেওয়া। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। মিডিয়াকে শুধু জিপিএ-৫-ধারীদের গল্প না বলে, বিভিন্ন দক্ষতা ও সংগ্রামের গল্প তুলে ধরতে হবে। ‘জিপিএ-৫ পেলেই সব ঠিক’—এই চিন্তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে করে তুলছে নিষ্ঠুর ও যান্ত্রিক। এই ধারণা বদলানো না গেলে আমরা হয়তো ভালো রেজাল্ট পাওয়া কিছু শিক্ষার্থী পাব, কিন্তু হারাব অসংখ্য সম্ভাবনাময়ী মানুষ গড়ার সুযোগ।
লেখক : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













