দেশে বর্তমানে অগ্নিকাণ্ড বাড়ছেই। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) এক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মধ্যেই গতকাল হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো সেকশন আগুনে জ্বলে উঠল। এছাড়া, গাজীপুরের টঙ্গীতে সম্প্রতি একটি রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডে তিন জন ফায়ার ফাইটারসহ চার জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যেই মিরপুরের শিয়ালবাড়ীর অগ্নিকাণ্ডে ঝরে গেছে ১৬ তাজা প্রাণ, দগ্ধ হয়েছে অনেকে। এ ঘটনায় গুদামের রাসায়নিক পদার্থ পুড়ে ক্লোরিন গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে। ফুসফুস, ত্বক, নাক, কান, গলার জন্য ক্লোরিন গ্যাস ব্যাপক ক্ষতিকর। ফলে সেই এলাকা জুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি, অর্থাত্ দৈনিক গড়ে ৭৩টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। আগুনের ঘটনায় জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সাধারণত খুবই স্পর্শকাতর। এতে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। অথচ অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে কোনো উন্নত পরিকল্পনা ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি অগুনের ঘটনা শহরাঞ্চলে। এর মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। শহরে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে রাসায়নিক কারখানা, কাপড়ের মার্কেটসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের গুদাম। ছড়ানো-ছিটানো বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ রাস্তাঘাটে অহরহ দেখা যায়। এজন্য শহরের কোনো স্থানে অগ্নিকাণ্ড হলে তা অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটায়। এছাড়া, বিড়ি-সিগারেটের আগুন ফেলায় অসতর্কতা, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো, রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অসাবধানতা, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে অসতর্কতা, দুষ্কৃতকারীদের দেওয়া আগুন, গৃহস্থালির কাজের আগুন প্রভৃতি কারণে সচারাচর অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে।
অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো আমাদের দেশের অনুন্নত অগ্নি নির্বাপণব্যবস্থা। আমাদের ফায়ার স্টেশনগুলোতে অনেক সংকট রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। উন্নত দেশের ফায়ার সার্ভিসে এখন ড্রোন, রোবট ও রিমোট নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ব্যবহার করে ঝুঁকিহীনভাবে দ্রুত আগুন নেভানো হয়ে থাকে। আমাদের মতো অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ফায়ার সার্ভিসে এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তির সংযোজন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, ভুল তথ্যের কারণে ফায়ার ফাইটারদের জীবন আরো অনিরাপদ হয়ে উঠছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে গুদামের ভেতরে থাকা অজ্ঞাত কেমিক্যালের ড্রাম বিস্ফোরণে ফায়ার ফাইটারের মৃত্যুতে এটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অগ্নিকাণ্ড থেকে বাঁচতে ভবনে ভালো মানের ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখতে হবে এবং সবাইকে এর সঠিক ব্যবহার শিখতে হবে। অনেক সময় দূরবর্তী স্থানে, কিংবা ঘিঞ্জি এলাকায় ফায়ার ফাইটারদের পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ার কারণে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে দেশের ফায়ার সার্ভিসে আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে। ফায়ার ফাইটারদের আরো উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অগ্নিনির্বাপণে করণীয় সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, হতে হবে সতর্ক, সচেতন।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













