মানুষ স্বাভাবিক জন্মের স্বাদ পেলেও স্বাভাবিক মৃত্যুর অনিশ্চয়তা পিছু ছোটে জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি। এরই মধ্যে সম্মুখীন হতে হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানান কৃত্রিম প্রতিকূলতার। এমন প্রতিকূল স্রোতের একজন লালন সাঁই। ‘আসবার কালে কি জাত ছিলে/ এসে তুমি কি জাত নিলে/ কি জাত হবে যাবার কালে/ সেই কথা ভেবে বলো না’। মানুষের ভূমিষ্ঠ হওয়া কিংবা মৃত্যুর ধরন এক ও অভিন্ন; গায়ে থাকে না জাতের কোনো গন্ধ।
তবু জাতের দোহাই দিয়ে সমাজব্যবস্থা, ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, রূঢ়তায় ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া সমাজপতিরা জীবপ্রেম ও মানবধর্মকে গিলে খেয়েছে যুগে যুগে। সব ধর্মে মানবতার স্লোগান অন্তর্নিহিত থাকলেও এর ঘ্রাণে সবাই মনে সহানুভূতি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। এটি যতটুকু একজন অনুসারী ব্যক্তির ব্যর্থতা; তার চেয়ে বেশি দায় সমাজ ও প্রতিবেশের। এসব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে সাঁইজির লালিত মানবধর্ম অস্পর্শী হূদে দাগ কেটেছে। শত সহস্র প্রশ্ন রেখে গেছেন সমাজে নিষ্ঠুরতা প্রতিপালকের কাছে।
সমাজপতিদের এমন ভাঁড়ামি কেউ মুখ খুলে প্রকাশ করতে না পারলেও এ মহাত্মার ভাষায় ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি/ সবই দেখি তা না না না/ জাত গেলো জাত গেলো বলে/ একি আজব কারখানা’। এ গানের মাধ্যমে তিনি সমাজের শেকড়ে নাড়া দিয়েছেন; যার প্রাসঙ্গিকতা সমাজে দিন দিন বাড়ছে বহুগুণে। তিনি লেবাসধারীদের মুখোশ উন্মোচন করে মানবতার মানুষের অন্বেষণে ছুটে চলেছিলেন নিরবধি। সব বাধা পেরিয়ে সত্য, সুন্দর পথে চলার শাশ্বত আহ্বান। আজও আমরা এ গানের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের নিশান ওড়াতে কতটুকু সফল হয়েছি; তা বর্তমান পরিস্থিতি জানান দেয় নিয়মিত।
বৈষ্ণব, সুফি, বাউল, মানবতার ভাবধারার দ্রবণে দ্রবীভূত নিজস্ব সক্রিয়তার লালন সংগীতে দেশজ, লোকজের অভূতপূর্ব মিশ্রণ। রূপক-উপমায় ও ব্যঞ্জনায় তা স্বতন্ত্র, অনন্য। মানবতার অন্তরালে যুদ্ধ, বিগ্রহ, ভিন্ন বা একই সম্প্রদায়ে দাঙ্গা, হানাহানি আজও নিয়মিত বিষয়। জীবিত মানুষকে জনসম্মুখে পিটিয়ে বা আঘাতে হত্যা; অমানবিকতার এ সর্বনিম্নস্তরেও আমাদের বিবেক কতটুকু সবল বা সচল, তা অনুমেয়। সবার চোখ থাকলেও আপাতপক্ষে কয়জন তা দেখতে পায়। এমন নীরবতায় মানবতার প্রসঙ্গটি প্রশ্নবানে তেপান্তরের ঘূর্ণিপাকে বসত করে।
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ মানুষ ছেড়ে খ্যাপারে, তুই মূল হারাবি’। মানুষ নিয়ে নীরব সুরের চমত্কার সরব বার্তা। এটিই যে লালনের মানবমহিমা ও মানববন্দনা মিশ্রিত ধর্মতত্ত্বের মূলরূপ। গুরু সিরাজ শাহের নির্দেশিত পথেই আরশিনগরে পড়শিকে এভাবে সন্ধান করেছেন আর মানুষ-ভজনের মধ্য দিয়েই তিনি সবকিছুর সমাধান পেয়েছেন। তার প্রদর্শিত ধর্মপথেই ভেদবুদ্ধিহীন মানবতার উদার পরিসরে সাম্য ও প্রেমের সুউচ্চ মিনারে বসেই সাধনা করেছেন এবং আমৃত্যু তা খুঁজেছেন। মানুষ ভজনের উদারতায় সহস্র যুগ পিছিয়ে আমরা। পরিবার ও সমাজে অস্তিরতা, সহিংতা, অপরমতসহিষ্ণুতায় এটি সত্য ও জীবন্ত। খাঁটি মানুষ হওয়ার এ পথে তার এ আহ্বান যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি/ কেমনে আসে যায়/ ধরতে পারলে মন-বেড়ি/ দিতাম তার পায়’। জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সম্পর্ক নির্ণয়ে সদা সাধন-ভজনে মগ্ন ছিলেন সাঁইজি। দেখেছেন অদ্বৈতভাবে— ‘আপনারে আপন চিনেছে যে জন/ দেখতে পাবে সেই রূপের কিরণ/ সেই আপন আপন রূপ, সেবা কোন স্বরূপ/ স্বরূপেরও সেই রূপ জানিও কারণ/ আত্মা দিয়া আত্মার করো রে ভজন।’ এমন বাণী দার্শনিক সক্রেটিসের ‘Know thyself’ কিংবা ইসলাম ধর্মের ‘মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’ এরই বহিঃপ্রকাশ। রকমভেদের গণ্ডি পেরিয়ে স্পষ্ট সম্মিলন, ‘আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে/ দিব্যজ্ঞানী সেই হয়েছে’। বর্তমানে নিজেকে জানার বা চেনার চেষ্টা করা লোকের সংখ্যা হাতে গোনা।
আত্মিকভাবে অশুদ্ধ হওয়ার যন্ত্রণায় আমরা অন্যকেও সমান দোষী, অপরাধী বা পাপী হিসেবে বিবেচনা করতে কুণ্ঠা বোধ করি না। নিজেকেই সঠিক বলে সত্যায়িত ও প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত থাকে। যেখানে নৈরাজ্য ও অমানবিকতা সর্বগ্রাসী হয়ে হাঁক মারে। জীবাত্মা ও পরমাত্মার অপার মিলনে আত্মতত্ত্বে, ‘আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে/ তারে জনমভর একবারে দেখলাম না রে’—নিজেকে নিজের বিস্ময়কর আবিষ্কারের নিরন্তর চেষ্টা। সাধন-জীবনে দুঃখ-বিষাদ-যন্ত্রণা-দ্বন্দ্ব-বিভেদ অতিক্রমে পরম আরাধ্যকে ধরতে মিলন ব্যাকুলতার বান কীভাবে তার হূদয়তন্ত্রীতে ডেকে ওঠে, তা বোঝা যায়—‘আমার মনের মানুষের সনে/ মিলন হবে কত দিন’ গানটি শুনলে। বর্তমানে যেখানে যান্ত্রিকতার বাস্তবতায় মনের মানুষ ধুলোর মেলায়।
সম্প্রদায়-ধর্মের সংকীর্ণ দেওয়াল ভেঙে উদার মিলনময়দানে পরমতত্ত্বের জোরে লালন অন্বেষণ করলেন ‘আলেক সাঁই’কে। ‘ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই’, ‘অধরকে অধর দিয়ে ধরতে হয়’, ‘আত্মা ও পরমাত্মার মিলনে পরম পুরুষ’—এসবই পরমতত্ত্বে পরম পাওয়া। পরমাত্মা যে দয়াল; যার কাছে আত্মসমর্পণ, আত্মনিবেদন সময়সাপেক্ষ, তা ফকির লালনের ভাষায়, ‘পারে লয়ে যাও আমায়/ (আমি) অপার হয়ে বসে আছি ও হে দয়াময়/ একা রৈলাম ঘাটে/ ভানু সে বসিল পাটে/ তুমি বিনে ঘোর সংকটে দেখি না উপায়’। বিভ্রান্ত বিপত্সংকুলে পরম আর্ত এবং দয়াময়ের নিকট নিজেকে সোপর্দ করার সুর।
জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়টিতে জগতে নিজের ইতিবাচক উপস্থাপনা বা অবদান রাখার ওপর নির্ভর করে জগতে স্মরণীয় হয়ে থাকে কালে কালে। বিপরীতে নেতিবাচক কর্মে নাম থাকে ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে।
লেখক : কবি ও তথ্য অফিসার।
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













