ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এই মাছের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, দেশের অর্থনীতি এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা। ভোজন রসিক বাঙালির খাবারের তালিকায় ইলিশ অত্যন্ত পছন্দের একটি মাছ। নদীমাতৃক এদেশের আনাচে-কানাচে খাল-বিল, নদী-নালায় রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল মাছ পাওয়া গেলেও ইলিশের চাহিদা রয়েছে শীর্ষে। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে বাঙলা নববর্ষসহ এদেশের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবারের তালিকায় ইলিশ মাছ অপরিহার্য একটি খাবার। স্বাদ, গন্ধ এবং রূপে কোনটিতেই ঘাতটি নেই জাতীয় মাছ ইলিশের।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এজন্য বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে কাজ করে আসছে ইলিশ। বিশেষ করে আমাদের দেশের পদ্মা, মেঘনা, গোদাবরী নদীসহ বঙ্গোপসাগরে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় চাঁদপুরকে ‘ইলিশের বাড়ি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। পৃথিবীতে ১১টি দেশে ইলিশ উৎপাদন হলেও সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৬ শতাংশ ইলিশ বাংলাদেশেই উৎপাদিত হয়।
একটা মা-ইলিশ সাধারণত চার থেকে পাঁচ লাখ ডিম ছাড়ে। যা বিশেষ কোনো পরিচর্যা ছাড়াই দ্রুত বেড়ে ওঠে। নদী এবং সাগরের অসীম জলরাশিতে ছড়িয়ে পড়ে এসব জাটকা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিষেধাজ্ঞার এই নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে আমাদের কিছু জেলে অবৈধভাবে এই মা ইলিশ শিকার করে। তারা জাল-দড়ি নিয়ে প্রশাসনের অভিযানের আড়ালে গিয়ে ফাঁদ পেতে থাকে ইলিশ ধরার জন্য। অল্প সময়ে এবং সহজেই অধিক ইলিশ ধরতে পারার লোভে তারা প্রজননক্ষম এসব মা ইলিশ শিকার করে। এতে লাখ লাখ ডিমসহ মা ইলিশগুলো জেলেদের জালে শিকার হচ্ছে। ফলে মা ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে জাটকা উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে।
এদেশের মৎস্যজীবীরা নদী বা সাগরে গিয়ে ইলিশ আহরন করে জীবন-জীবিকা চালায়। এসব ইলিশ দেশের মানুষ খাওয়ার পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে প্রতি বছর অনেক টাকা উপার্জন করা হয়। কিন্তু গত দুই দশকে ইলিশের প্রজনন হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে আমাদের নদীগুলোতে বা সমুদ্রে গিয়ে জেলেরা আগের মতো আর ইলিশ পাচ্ছে না। কিছু জেলে অতিমুনাফার লোভে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবাধে মা ইলিশ শিকার করছে। পাশাপাশি নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, কীটনাশক ও প্লাস্টিক দূষণে ইলিশের বিচরণ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে ইলিশের উৎপাদন ব্যবহত হচ্ছে। অনেক জেলে ইলিশ না পেয়ে পেশা পরিবর্তন করছে। এজন্য ইলিশ রক্ষায় আমাদের আরো আন্তরিক হতে হবে।
সাধারণত আমরা জানি, ইলিশ প্রধানত সামুদ্রিক মাছ হলেও প্রজনন সময়ে এ মাছ বেছে নেয় স্বাদু পানিকে। স্বাদু পানিতে এসে তারা ডিম ছাড়ে। এ সময় এরা ঝাঁকে ঝাঁকে বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্ব অংশের কিছু নদীতে আগমন করে। তখনই মা ইলিশে ভরে উঠে আমাদের পদ্মা, মেঘনাসহ আরো বেশকিছু নদী। এবছরও প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে চলছে ৪ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ রয়েছে। এসব মা ইলিশ রক্ষা করতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতি বছরই এই নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা বন্ধের ঘোষনা দেয়। যাতে মা ইলিশ ঠিক মতো ডিম ছাড়তে পারে এবং আমাদের নদী ও সাগরে জাটকার উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। সূত্র বলছে, একটা মা-ইলিশ সাধারণত চার থেকে পাঁচ লাখ ডিম ছাড়ে। যা বিশেষ কোনো পরিচর্যা ছাড়াই দ্রুত বেড়ে ওঠে। নদী এবং সাগরের অসীম জলরাশিতে ছড়িয়ে পড়ে এসব জাটকা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিষেধাজ্ঞার এই নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে আমাদের কিছু জেলে অবৈধভাবে এই মা ইলিশ শিকার করে। তারা জাল-দড়ি নিয়ে প্রশাসনের অভিযানের আড়ালে গিয়ে ফাঁদ পেতে থাকে ইলিশ ধরার জন্য। অল্প সময়ে এবং সহজেই অধিক ইলিশ ধরতে পারার লোভে তারা প্রজননক্ষম এসব মা ইলিশ শিকার করে। এতে লাখ লাখ ডিমসহ মা ইলিশগুলো জেলেদের জালে শিকার হচ্ছে। ফলে মা ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে জাটকা উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে।
প্রতিবছরই আমরা দেখি, সরকার এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও কিছু জেলে তা অমান্য করে নদীতে চুরি করে মা ইলিশ শিকার করে। দেশের বিভিন্ন নদীতে তারা সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে জাল ফেলে। এবছরও নিষেধাজ্ঞার কয়েকদিন যেতে না যেতে চাঁদপুর ও আশপাশের নদ-নদীতে ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান’ চালিয়ে ১১ জেলেকে আটক করা হয়েছে। এভাবে অনেক নদীতে তারা অতিরিক্ত লাভের আশায় অবৈধভাবে মাছ শিকার করে। বেশিরভাগ সময় তাদের অভিযোগ থাকে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু মাঠপর্যায়ের প্রেক্ষাপট থাকে ভিন্ন। মূলত অধিক লাভের আশায় তারা এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। অনেক সময় দেখা যায়, দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যরাও এর সাথে জড়িত থাকে। এজন্য শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই মা ইলিশ সংরক্ষণ করা যাবে না। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। নৌপুলিশ বা কোস্টগার্ডের অভিযান সফল করতে প্রয়োজনীয় দ্রুতগামী যানসহ আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বাজারজাতকরণ বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে সংশ্লিষ্টদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এছাড়া আইনে বলা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হলে কমপক্ষে এক থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এসব আইনের বিষয়ে আপোষহীন হতে হবে। যেসব জেলেদের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাদের তালিকা স্বচ্ছতার সাথে প্রস্তুত করে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারিভাবে দেওয়া সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে কিনাু সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে আরো বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, প্রশাসনিক কঠোর উদ্যোগ, সাধারণ মানুষের মাঝে জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন মধ্যে দিয়ে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব। আর তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ইলিশ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমাদের সকলের আন্তরিকতা ও সমন্বিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই।
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













