সেডিমেন্ট বলতে নদীবাহিত পলি (সিল্ট) ও কদর্ম (ক্লে)-কে বোঝায়। যেগুলি সাধারণত অত্যন্ত বেশি পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ ও উর্বর; যা কৃষিকাজ ও ফসল উত্পাদনে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই গঙ্গা, ব্রক্ষপুত্র ও মেঘনা নদীর মাধ্যমে পরিবাহিত সেডিমেন্ট দিয়ে গঠিত। এ সেডিমেন্ট একদিকে নদী ও সমুদ্রে চর, উপচর, দ্বীপ, উপদ্বীপ ইত্যাদি তৈরি করছে; অন্যদিকে নদীর নাব্য ও গতিপথ পরিবর্তন করছে। বাংলাদেশের নদীসমূহ প্রতিনিয়ত নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। তাছাড়া গঙ্গাবাহিত সেডিমেন্টস আর্সেনিকবাহী বা আর্সেনিকসমৃদ্ধ মর্মে অনেক বিজ্ঞানী মতামত প্রকাশ করেছেন। সেজন্য আমাদের দেশের সেডিমেন্টের স্ট্যাটাসটা জানা অতীব জরুরি।
সেডিমেন্টস সিংগাপুর, কাতার, দুবাই প্রভৃতি দেশে রপ্তানি করা যেতে পারে বলে একজন অধ্যাপক জানান। ঐসব দেশসমূহ সেডিমেন্টস কৃষিকাজ, খামার, বিনোদনকেন্দ্র নগনরায়ণ ও নতুন নতুন ভূমি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উপরন্তু, বাংলাদেশের সেডিমেন্টস-সমূহ নদনদীর পানি দ্বারা পরিবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে। সেজন্য বাংলাদেশের নদনদী ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে ক্রসড্যাম দিয়ে নতুন নতুন ভূখণ্ড তৈরি করা সম্ভব মর্মে গবেষকরা বলছেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সেডিমেন্টস বঙ্গোপসাগরে জমা হয়। বাংলাদেশের বড় বড় নদীকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। গঙ্গা (পদ্মা), ব্রক্ষপুত্র ও মেঘনা। এ তিনটি নদী ও নদীসমূহের দ্বারা প্রতি বছর ২.৪৬ বিলিয়ন টন এবং ২.৫ বিলিয়ন টন সেডিমেন্টস বঙ্গোপসাগরে জমা হয় মর্মে যথাক্রমে কোলম্যান (১৯৬৯) এবং হোসেন (১৯৯২) তাদের গবেষণা থেকে প্রকাশ করেছেন।
তাছাড়া সিদ্দিক, আনোয়ার (১৯৮৯) ও বরুয়া (১৯৯১) তাদের গবেষণা থেকেও একই রূপ মতামত দেন যে, প্রতি বছর বাংলাদেশের নদীগুলো দিয়ে বিপুল পরিমাণ সেডিমেন্টস বঙ্গোপসাগরে জমা হচ্ছে। একদিকে, এসব সেডিমেন্টস আমাদের নদীর তলদেশ ভরাট করছে। তাই নদীসমূহ খনন করতে হবে। কারণ এ নদীসমূহ আমাদের জীবন-জীবিকা, প্রাণী, জলজ প্রাণী, মত্স্য, জীব-বৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশকে বাঁচিয়ে রাখে। অন্যদিকে সেডিমেন্টস বিক্রি করা বা রপ্তানি করা যেতে পারে। আর সেজন্য সেডিমেন্টস রপ্তানি বা দেশীয় কোনো কাজে খাটানোর আগে তার স্ট্যাটাসটা জানা জরুরি। বিশেষ করে সেডিমেন্টস-সমূহ মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ভক্ষণের মাধ্যমে সেডিমেন্টসের দূষক ‘ফুড চেইন’ চলে আসতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েক জন পরিবেশ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে সেডিমেন্টস নিয়ে কাজ করা প্রসঙ্গে আগে একটু আলোচনা করেছি এবং অনলাইন থেকে জানা যায়, দেশে সেডিমেন্টস নিয়ে খুবই কম কাজ হয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে এ গুরুত্বপূর্ণ দিকটার দিকে একটু নজর দিতে হবে। এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স পড়ানো হচ্ছে। সেডিমেন্টসকে সিলেভাসে কি একটু সংযোজন করা যায় না? আবার অনেকে মনে করছেন, সেডিমেন্টস সাম্পলিং জটিল ও কঠিন; এ প্রেক্ষিতে বলতে চাই।
মূল বিষয় হলো পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক কমপোন্টে বা উপাদান হলো সেডিমেন্টস। তাই এটাকে অবহেলা করা উচিত হবে না। সংশ্লিষ্ট গবেষকরা অবশ্য সেডিমেন্টস নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন মর্মে স্বীকার করেছেন। অন্য একজন বিজ্ঞানী অবশ্য বলছিলেন সেডিমেন্টস স্যামপিলিং একটা সমস্যা। অন্য একজন বিজ্ঞানী বলছিলেন—নদীর বা সমুদ্রের ক্যাচমেন্ট বা গভীর থেকে স্যামপিলিং করতে হবে। পিএইচডি প্রোগ্রামে সেডিমেন্ট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সেডিমেন্ট স্যামপিলিং খুবই সহজ এবং এতে খুবই কম খরচ হয়ে থাকে। কেবল একটা ভ্যান ভিন গ্রাব (Van Veen Grab) স্যাম্পলার হলেই সেডিমেন্ট স্যাম্পলিং করা যায়।
আরো বলতে চাই; নদীর গভীরতা থেকেও স্যাম্পল নেওয়া যায়; আবার সারফেস সেডিমেন্ট নিয়েও গবেষণা করা যায়। উল্লেখ্য যে, সেডিমেন্টের ইন সি টু (In-Situ) কোনো প্যারামিটার নির্ণয় না করলেও চলে। খুবই কম খরচে বলতে গেলে বিনা খরচে সেডিমেন্টস স্যাম্পলিং করা যায়। তাই এখন আমাদের সেডিমেন্টসের স্ট্যাটাস পরীক্ষা করতে হবে। উচ্চতর শিক্ষার সময়ে মালয়েশিয়ার পাহাং স্টেটের তাংগুক নদীর সেডিমেন্টস নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সে সময়ে তাংগুক নদীর সেডিমেন্টের হেভিমেটালের মধ্যে আর্সেনিক, কোবাল্ট, ক্রোমিয়াম, কপার, মারকারি ও লেডের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। বিশ্লেষিত ফলাফলে দেখা যায়, আর্সেনিক দূষণের পরিমাণ অনুমোদিত মাত্রা থেকে কোনো কোনো স্থানের নমুনায় তিন গুণেরও বেশি পাওয়া যায়; কোবাল্ট দূষণের মাত্রা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে ৭০ গুণ বেশি পাওয়া যায়; মারকারি দূষণের মাত্রা অনুমোদিত মাত্রা থেকে ৩১.৯ গুণ এবং লেড দূষণের মাত্রা অনুমোদিত মাত্রার থেকে ১৬ গুণ বেশি পাওয়া যায়।
একটি সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের শিতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদের সেডিমেন্টে ক্রোমিয়ামের মাত্রা বেশি। আবার বুড়িগঙ্গা নদীর সেডিমেন্টে লেড ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত মাত্রা থেকে বেশি পাওয়া যায়। উপরন্তু বুড়িগঙ্গা, শিতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদের সেডিমেন্টে আর্সেনিক, জিংক ও কপারের পরিমাণও বেশি পাওয়া যায়। সেজন্য আমাদের দেশের নদীসমূহের সেডিমেন্ট পরীক্ষা করে সেগুলোর স্ট্যাটাস জানা অতীব প্রয়োজন।
যাহোক বাংলাদেশে সেডিমেন্ট নিয়ে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সবার এদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। উপরন্তু, আমাদের দেশের সেডিমেন্ট দূষণের উত্স্যসমূহ খুঁজে বের করতে হবে এবং প্রয়োজনে দূষণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের দেশে সেডিমেন্ট দূষিত হয়ে থাকে বিভিন্ন উপায়ে। শহর ও নগরের বর্জ্য, বর্জ্য পানি, কলকারখানার বর্জ্য, বর্জ্য পানি, জাহাজ ভাঙা শিল্প, গৃহস্থালির বর্জ্য, বর্জ্য পানি, মলমূত্র, প্লাস্টিক, পলিথিন; কীটনাশক ও রাসায়নিক সার থেকে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ফসলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তীকালে অতিরিক্ত অংশ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পার্শ্ববর্তী নদীর পলিতে মিশ্রিত হয়। তাছাড়া গঙ্গাবাহিত পলল আর্সেনিক-সমৃদ্ধ বলে অনেক গবেষকের গবেষণা থেকে জানা যায়।
বাংলাদেশের সেডিমেন্টস, মৃত্তিকা ও পানির পরীক্ষার ক্ষেত্রে দেখেছি; আমরা শুধু হেভিমেটালের মধ্যে আর্সেনিক পরীক্ষা করে থাকি। কিন্তু আর্সেনিক ছাড়াও আরো অনেক হেভিমেটাল; যেমন—লেড, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, এনটিমনি, নিকেল, জিংক প্রভৃতিও পরীক্ষা করা দরকার। এগুলোরও অনেক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। হেভিমেটাল মানুষের ত্বকের রোগ, হৃদযন্ত্র, কিডনি, স্নায়বিক সমস্যা, শ্বাসযন্ত্র, লিভার প্রভৃতি রোগের কারণ হয়ে থাকে এবং পানির গুণাগুণ নষ্ট করে থাকে এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতি করে থাকে।
পরিশেষে বলতে চাই, পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমপোনেন্ট বা উপাদানসমূহের প্ররক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ সেডিমেন্টস রপ্তানি এবং এর সঠিক ও সুচারুরূপে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রভূত লাভবান হতে পারে। সে প্রেক্ষিতে বলা যায়, সেডিমেন্টসের পরীক্ষা (Test) করা জরুরি এবং তার স্ট্যাটাস জানা অতীব প্রয়োজনীয়। তাছাড়া, সেডিমেন্টস পরীক্ষা না করে ব্যবহার করলে মানুষের খাদ্যচক্রে তার ক্ষতিকর উপাদানসমূহ প্রবেশ করতে পারে; যা সমাজ ও সভ্যতার জন্য এক বড় হুমকি। তাই আমাদের যৌক্তিকভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে সমাজ, সংসার ও সভ্যতা উপকৃত হবে।













