পুরান ঢাকার চকবাজারের প্রতিষ্ঠান আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের শেয়ার ও শতকোটি টাকার সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে সংস্থাটি।
মামলার বাদী আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডার কানিজ ফাতেমা। গত বছর তিনি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটি করেন। মামলায় জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার করে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, শেয়ার হস্তান্তর, সম্পত্তি বিক্রি এবং কম দামে জমি কেনাবেচা দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের এমডি সদরুল ইসলাম, আলাউদ্দিন সুইটমিটের পরিচালক সুফিয়া বেগম, জেরিন আহম্মেদ, মো. ফাহমিদ ও মো. মারুফ আহম্মদ এবং প্যানসিয়া সার্ভিসেস (প্রা.) লিমিটেডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির শাহজালাল মুনসী বলেন, ‘মামলার তদন্ত করতে গিয়ে যা যা সত্য পাওয়া গেছে তার সবটাই আমি বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করেছি। এখন আদালত বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলার পরবর্তী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’
মামলার নথি ও সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি একটি কথিত চুক্তিপত্রের মাধ্যমে আলাউদ্দিন সুইটমিটের শেয়ার কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ১ লাখ ১১ হাজারে উন্নীত করার পর মৃত শেয়ারহোল্ডারদের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য শেয়ার না দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ৫৪ হাজার ৫৩৬টি শেয়ার অন্য ব্যক্তিদের নামে স্থানান্তর করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় জাল কাগজপত্র তৈরি করে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য দাখিল করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে জাল নথি তৈরির অভিযোগও আনা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল জাল হলফনামা ও অডিট প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এসব নথির ভিত্তিতে ওই বছরের ২৮ জুন কোম্পানি বন্ধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। বাদী কানিজ ফাতেমা সে সময় দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তার স্বাক্ষর জাল করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ। একইভাবে কয়েকজন শেয়ারহোল্ডারের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগও রয়েছে।
শুধু শেয়ার হস্তান্তর নয়, কোম্পানির জমি বিক্রির ক্ষেত্রেও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, কোম্পানির ২০ জন পরিচালকের মধ্যে ১৫ জনের স্বাক্ষর জাল করে একটি বোর্ড রেজুলেশন তৈরি করা হয়। ওই রেজুলেশনের ভিত্তিতে রাজধানীর মিরপুরে কোম্পানির ২০ দশমিক ৮৩৩২৫ কাঠা জমি বিক্রির অনুমোদন নেওয়া হয়। পরে জাল দলিলের মাধ্যমে জমিটি হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের হিসাবে, ওই জমির প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু দলিলে জমিটির মূল্য দেখানো হয় মাত্র ১৭ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা গোপনে লেনদেনের মাধ্যমে আত্মসাৎ এবং একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মিরপুরের একই এলাকায় কোম্পানির আরও ১০ দশমিক ৪১৬৬ কাঠা জমি নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, ওই জমির প্রকৃত মূল্য ছিল ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ দলিলে মূল্য দেখানো হয় মাত্র ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এতে প্রায় ২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা গোপনে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলেও মামলায় দাবি করা হয়।
এসব অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কথা জানিয়েছে সিআইডি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে জাল চুক্তিপত্র, স্বাক্ষর, হলফনামা, অডিট প্রতিবেদন, বোর্ড রেজুলেশন ও দলিল ব্যবহার করে কোম্পানির শেয়ার ও সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে কোম্পানির বিভিন্ন রেকর্ড, একাধিক দলিল, পাসপোর্ট, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং নিবন্ধন-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ও দলিলে প্রদর্শিত মূল্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কম মূল্যে সম্পত্তি বিক্রি দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির শাহজালাল মুনসী বলেন, ‘মামলার তদন্ত করতে গিয়ে যা যা সত্য পাওয়া গেছে তার সবটাই আমি বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করেছি। এখন আদালত বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলার পরবর্তী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’
এজাহারে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৪, ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭২ ও ৫০৬ ধারায় অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সিআইডির প্রতিবেদনে এসব ধারায় অপরাধ সংঘটনের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৩১২ ধারায় অপরাধ সংঘটনের প্রমাণ পাওয়ার কথাও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাদীপক্ষের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়া সাজ্জাদ উল্লাহ রনি বলেন, ২০১৬ সালে দলিলে জমির যে মূল্য দেখানো হয়েছিল, তা ওই সময়ের মৌজা ও বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম ছিল। তার দাবি, তখন জমিটির প্রকৃত মূল্য প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ কোটি টাকা হলেও জালিয়াতির মাধ্যমে দলিলে কম মূল্য দেখানো হয়। বর্তমানে ওই সম্পত্তির মূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি। সে হিসাবে সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা হিসাব করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাদীপক্ষ। বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার একরামুল হকের মতে, ‘এ মামলা বিচারক পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন এবং আসামিদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিচারকাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে পরিচালনা করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিচারক আদালত প্রাঙ্গণে বিবাদী পক্ষের আইনজীবীসহ অন্যদের হট্টগোলে প্ররোচিত হয়ে একইদিন সমন জারি করেন আবার সেটি বাতিল করারও আদেশ দেন, যা আইনতসিদ্ধ নয়।’ সমন জারি ও বাতিল-সংক্রান্ত কার্যতালিকাও তিনি প্রতিবেদককে দেন। বাদীপক্ষের অভিযোগ, আসামিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন ও এসএমএস করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিবাদীপক্ষের আইনজীবী এবং প্রতিষ্ঠানটির লিগ্যাল ডিপার্টমেন্টের অ্যাডভোকেট শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলা বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।













