অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ কি হারিয়ে ফেলছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়? এই প্রশ্ন করার আজ অবকাশ রয়েছে বটে! টাকা মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। খাবার, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা—জীবনের প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনের সঙ্গেই অর্থের সম্পর্ক রয়েছে অবিচ্ছেদ্যভাবে। অর্থ ছাড়া জীবনযাপন কঠিন। কিন্তু সেই অর্থ যখন জীবনের প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যম না হয়ে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তখনই প্রশ্ন দেখা দেয়—টাকা কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষই টাকার জন্য? এমন কথাও বহুল প্রচলিত আছে, ‘অর্থই অনর্থের মূল!’
অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, বর্তমান সময়ে অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা যেন ক্রমেই তীব্রতর হয়ে উঠছে। ভালো থাকার চেয়ে বরং ভালো দেখানোর প্রতিযোগিতাই অনেক ক্ষেত্রে বড় হয়ে উঠেছে। কার কত বড় বাড়ি, কী গাড়ি, কোথায় ভ্রমণ, সন্তানের পড়াশোনা কোথায়—এসবের মধ্য দিয়ে সামাজিক অবস্থান নির্ধারণের প্রবণতা যেন কেবল বাড়ছেই। ফলে প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে মানুষ ছুটছে আরও বেশি অর্থের পেছনে। চাই চাই-ই যেন আজকের সমাজের বাস্তব চিত্র! আর এই ছুটে চলার পথে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি হারিয়ে যাচ্ছে, তা হলো সময়।
একজন মানুষ হয়তো পরিবারের ভবিষ্যৎ ‘নিরাপদ করার জন্য’ দিনের পর দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। প্রিয় সন্তানসন্ততিকে ভালো রাখার জন্য অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত কাজ করছেন। পরিবারের জন্য বাড়ি করছেন, সঞ্চয় করছেন, সম্পদ গড়ছেন। কিন্তু সেই সন্তান যখন বড় হয়ে উঠছে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, তার শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে বাবা-মায়ের পাশে থাকার সুযোগই হয়নি। এ পর্যায়ে অর্থ আছে বটে, কিন্তু হারিয়ে গেছে সময়! আহা!
মূলত সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন মানুষের পরিচয় তার চরিত্র, মানবিকতা কিংবা সম্পর্ক দিয়ে নয়, বরং তার ব্যাংক ব্যালান্স, গাড়ি, বাড়ি কিংবা সম্পদ দিয়ে বিচার করা শুরু হয়। বর্তমান সমাজে আমরা কি এই সংস্কৃতিই বেশি দেখি না?
জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, হারানো টাকা অনেক সময় আবার উপার্জন করা সম্ভব, কিন্তু হারানো সময় আর ফিরে পাওয়া যায় না। অসুস্থ হয়ে পড়লে টাকা দিয়ে চিকিৎসা পাওয়া যায়, কিন্তু সুস্থ জীবনের মুহূর্তগুলো কেনা যায় কি? বড় বাড়ি তৈরি করা যায়, কিন্তু সেখানে পরিবার-পরিজনের ভালোবাসা জোর করে তৈরি করা যায় না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম, যার বাইরে যাওয়ার কোনোই সুযোগ নেই।
অর্থাৎ, অর্থ অবশ্যই প্রয়োজন। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছাড়া সুন্দর জীবনও অনেক সময় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে; বলতে হয় ‘কল্পনারও বাইরে’! তাই টাকাকে অস্বীকার করার আদৌ কোনো সুযোগ নেই। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলো, অর্থের সঙ্গে জীবনের একটি ভারসাম্য তৈরি করা।
মূলত সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন মানুষের পরিচয় তার চরিত্র, মানবিকতা কিংবা সম্পর্ক দিয়ে নয়, বরং তার ব্যাংক ব্যালান্স, গাড়ি, বাড়ি কিংবা সম্পদ দিয়ে বিচার করা শুরু হয়। বর্তমান সমাজে আমরা কি এই সংস্কৃতিই বেশি দেখি না?
জীবন একবারই আসে। অর্থ আবারও আসতে পারে—আজ নয়তো কাল! তাই অর্থের প্রয়োজনকে স্বীকার করে জীবনের মূল্যকে সবার ওপরে রাখাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা। আমরা কি এই প্রজ্ঞার মর্মবাণী উপলব্ধি করব না?
আমরা হামেশায় ভুলে যাই যে, একসময় মানুষ অর্থ উপার্জন করে জীবনকে সুন্দর করতে চায়। কিন্তু সেই অর্থ উপার্জনের জন্যই যদি জীবন থেকে আনন্দ, পরিবার, বন্ধুত্ব, স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তি হারিয়ে যায়, তাহলে সেই অর্জনের মূল্য কতটুকু?
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ সাধারণত কত টাকা উপার্জন করেছে, তার চেয়ে বেশি মনে করে—কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছে, কাকে ভালোবেসেছে, কার উপকার করেছে এবং নিজের জন্য কতটা জীবন বাঁচতে পেরেছে।
সুতরাং, অর্থ উপার্জন হোক, সম্পদ গড়ে উঠুক, ভবিষ্যৎ নিরাপদ হোক; কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে বর্তমান জীবন যেন হারিয়ে না যায়। আমরা যেন সম্পদের নিচে চাপা পড়ে মারা না পড়ি! কারণ, টাকা জীবনের প্রয়োজন মেটাতে পারে, জীবনকে কিছুটা সহজ করতে পারে; কিন্তু জীবনের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। এজন্য মানুষের হাতে টাকা থাকা দরকার, কিন্তু টাকার হাতে মানুষের জীবন থাকা উচিত নয়।
জীবন একবারই আসে। অর্থ আবারও আসতে পারে—আজ নয়তো কাল! তাই অর্থের প্রয়োজনকে স্বীকার করে জীবনের মূল্যকে সবার ওপরে রাখাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা। আমরা কি এই প্রজ্ঞার মর্মবাণী উপলব্ধি করব না?













