বিড়ালের মেজাজ-মর্জিটাই একেবারে আলাদা। মন চাইলে আদর পেতে লেজ নাড়াবে, আবার একটু বেশি আদর হলেই খামচে বসবে। গভীর রাতে হঠাত্ ঘুম ভেঙে ‘মিউ মিউ’ করে খেতে চাইবে; আবার ঘুম ভেঙে খাবার দিলে মুখ দিয়েই চলে যাবে। ডাকলে সাড়া নেই, অথচ তারই ইচ্ছায় কোলে এসে বসে থাকবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এত সব জটিলতা, অভিমান আর স্বেচ্ছাচারের পরও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়ালের কদরই সবচেয়ে বেশি। এই দ্বিচারিতা, এই স্বাধীনচেতা আচরণ বিড়ালকে একদিকে রহস্যময়, অন্যদিকে অদ্ভুতভাবে আপন করে তুলেছে।
বিড়ালের আরেকটি বিস্ময়কর ক্ষমতা হলো—বহুদূরে ফেলে এলেও সে পথ চিনে মালিকের বাসায় ফিরে আসতে পারে। এর প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও বিজ্ঞানীরা নানা ব্যাখ্যা দেন। কেউ বলেন, সূর্যের আলো দেখে দিক নির্ণয় করে; কেউ বলেন, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করেই বিড়াল নিজের অবস্থান বুঝে নেয়। যে কারণই হোক, এই ফিরে আসার ক্ষমতা বিড়ালকে মানুষের চোখে আরো প্রতীকী করে তুলেছে; হারিয়ে গিয়েও ফিরে আসা, নির্বাসন পেরিয়েও ঘরে ফেরা।
বাংলা ভাষায় বিড়াল নিয়ে প্রবাদ-প্রবচনেরও অভাব নেই। ‘ভিজে বিড়াল’ বলা হয় সেই মানুষকে, যে বাইরে অতিশয় বিনয়ী কিন্তু ভেতরে দুরভিসন্ধিতে ভরা। ভাবখানা এমন যেন ভাজা মাছ উলটে খেতেও জানে না। আসলে এতে বিড়ালের প্রতি একধরনের অবিচারই করা হয়। একই অর্থে আছে ‘বিড়াল তপস্বী’ বা সাধু সেজে থাকা ভণ্ড মানুষ। সমাজের কপটতার বোঝা যেন চুপচাপ বিড়ালের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিড়াল তার ঘরকে ভালোবাসে। বস্তায় ভরে দূরে ফেলে এলেও সে পথ চিনে ফিরে আসে। বাড়ির মানুষ মাছ-মাংস খেলে সে ‘মিউ মিউ’ করে ভাগ চায়। লাঠি দেখিয়ে তাড়ালেও কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসে। মানুষের মধ্যে অনেকেই আছেন—বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না; কিন্তু বিড়াল সেই ভদ্রতার ধার ধারে না। তার আচরণে ভালোবাসার দাবিটা সরাসরি, অকপট। মানুষ অবশ্য এটাকে ভালোবাসা না ভেবে বেহায়াপনা ভেবে বসেছে। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘বিড়ালের আড়াই পা’—বেহায়াপনার সমার্থক এক প্রবাদ। অথচ বিড়াল শুধু নিজের প্রাপ্যটাই চাইছে, আর কিছু নয়।
‘থলের বিড়াল বেরিয়ে গেছে’—গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ার এই প্রবচনের উত্সও বিড়ালকেন্দ্রিক। ব্রিটিশ সমাজে একসময় বস্তায় ভরা বিড়ালকে শূকরছানা বলে চালিয়ে দেওয়া হতো। বাড়িতে এনে থলে খুললে বের হতো বিড়াল; তাই রহস্য ভেদের প্রতীক হিসেবে এই প্রবাদ। এখানেও বিড়াল যেন প্রতারণার চিহ্ন, তুচ্ছ এক বস্তু। পশুপাখির দোকান থেকে দাম দিয়ে কিনে আনা বিড়ালের প্রতি এমন অবমূল্যায়ন বিড়ালপ্রিয় মানুষের কাছে সহজে মেনে নেওয়ার মতো নয়।
আর আছে বহুল প্রচলিত গল্প—‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’ ইঁদুরে উপদ্রুত এক বাড়িতে বিড়াল এনে ইঁদুর তাড়ানো হলো। ইঁদুরেরা সভা বসিয়ে সিদ্ধান্ত নিল, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধলে আগেই তার আগমন টের পাওয়া যাবে। পরিকল্পনা ভালো, সবাই প্রশংসা করল। কিন্তু শেষমেশ বৃদ্ধ ইঁদুরের প্রশ্নে সভা স্তব্ধ—‘ঘণ্টা বাঁধবে কে?’ বিপজ্জনক সত্যটা সবার জানা, যে ঘণ্টা বাঁধতে যাবে, বিড়াল তো তাকেই খপ করে সাবাড় করে দেবে। ফলে দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি নয়। তাতে করে পরিকল্পনা কাগজেই থেকে গেল।
এসব গল্প, প্রবাদ আর রূপক আসলে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিরই আয়না। আর ঠিক এই জায়গাতেই বিড়াল ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে—নীরবে, কিন্তু প্রবল শব্দ তুলে।
আমাদের রাজনীতিতে আলোচনার খোরাকের কোনোদিনই অভাব ছিল না। কখনো নির্বাচন, কখনো সংস্কার, কখনো সংবিধান—আর কখনো হঠাত্ করেই একটি বিড়াল। কালো না সাদা—সে বিতর্কে যাওয়ার দরকার নেই। রাজনৈতিক প্রবাদ আগেই বলে দিয়েছে, বিড়াল কেমন তা মুখ্য নয়, সে ইঁদুর ধরে কি না সেটাই আসল। প্রশ্ন হলো—এই বিড়ালটি কোন ইঁদুর ধরবে? দুর্নীতির, ক্ষমতার, নাকি শুধুই মিডিয়ার মনোযোগ?
সাম্প্রতিক রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিড়ালের আগমন ঘটে তারেক রহমানের সঙ্গে। শীতের কনকনে হাওয়ার মধ্যে নির্বাচনি উত্তাপ যখন রাজনীতি গরম করে তুলেছে, ঠিক তখনই বোমা ফাটানো খবর—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফিরছেন। কিন্তু এই খবরে চিনি কম, দুধ বেশি হয়ে গেল আরেক উপাদানে—তারেক রহমান একা নন, তার সঙ্গে লন্ডন থেকে এসেছে তার পোষা বিড়ালও। রাজনীতির বজ্রনিনাদ মুহূর্তে রূপ নিল এক দীর্ঘ ‘মিউ’তে।
বিমানবন্দরের দৃশ্য ছিল প্রতীকময়। একপাশে নিরাপত্তার কড়াকড়ি, বন্দুকের নল, কালো সুট। অন্য পাশে রাজনীতির ভারী লাগেজ—অতীত, মামলা, বিবৃতি আর সম্ভাবনা। আর ঠিক মধ্যখানে এক ক্যারিয়ার বাক্স—ভেতরে নির্বিকার বিড়াল। কোনো বক্তব্য নেই, কোনো শর্ত নেই। এক প্রত্যক্ষদর্শীর আফসোস, ‘মানুষ বছরের পর বছর ভিসা পায় না, আর এই বিড়াল নিমেষে সব কাগজপত্র ক্লিয়ার করেই ঢুকে গেল!’
সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ঝড়। কেউ বিশ্লেষণ করছে, কেউ উপহাস করছে, কেউ আবার গভীর রাতে ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করছে। একজন সর্ববিষয়ে বিশারদ লিখলেন, ‘এই বিড়াল কি কেবলই একটি প্রাণী? নাকি এটি একটি সুদূরপ্রসারী প্রতীক? লক্ষ করুন—সে নরম, সে তুলতুলে, কিন্তু তার থাবার নিচে লুকিয়ে আছে ধারালো নখ।’ এই এক পোস্টেই বিড়ালটি পশুর তালিকা থেকে উঠে গেল। জন্ম নিল এক নতুন সত্তা—‘পলিটিক্যাল এন্টিটি’।
কেউ কেউ কপালে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন তুললেন, ‘এই বিড়ালের রাজনৈতিক অবস্থান কী? সে কি ডানপন্থায় বিশ্বাসী, না বাম? নাকি সে সুবিধামতো মধ্যপন্থার লেজ নাড়ায়?’ অন্য পক্ষ তত্ক্ষণাত্ পালটা যুক্তি হাজির করলেন, ‘বিড়ালের স্বভাব হলো উঁচুতে বসা। এটা কি আগাম ক্ষমতার ইঙ্গিত? নাকি ব্রিটিশ হাইকমিশনের কোনো সফট ডিপ্লোম্যাসি?’
এখানেই শেষ নয়। বিড়ালের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও শুরু হলো জাতীয় পর্যায়ের তর্ক। একজন রীতিমতো গবেষণা করে জানালেন, ‘দেখা যাক, বিড়ালটি কি বিলেতি ক্যাটফুড ছাড়া কিছু খায়? নাকি দেশি ইঁদুর শিকার করে দেশপ্রেমের প্রমাণ দেবে?’
যখন বলা হলো, ‘বিড়ালটি পরিবারের, তবে এখন মনে হচ্ছে এটি সবার’—দেশ জুড়ে যেন এক পশলা স্বস্তি নেমে এলো। ভাবুন তো, যে দেশে রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যকে সহ্য করতে পারে না, সেখানে একটি ভিনদেশি বিড়াল রাতারাতি সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেল। এমন ঐক্য আমরা শেষ কবে দেখেছি?
ফেসবুকে এক হতাশ কর্মী লিখলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর নেতার পেছনে ঘুরি একখানা ভিআইপি পাশের জন্য, আর এই বিড়াল এক লাফে লন্ডন থেকে ঢাকায় এলো লাল গালিচায়! একেই বলে সঠিক রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা।’ রাজনীতিতে যেখানে মানুষের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে এক বিড়ালের দেশপ্রেম যাচাই—এটাই বোধহয় আমাদের মৌলিক সাফল্য।
সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সত্য সামনে এলো। মিমে, রসে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে বিড়াল হয়ে উঠল রাজনীতির নতুন মুখ—নীরব, কিন্তু সর্বত্র উপস্থিত।
রাজনীতির ইতিহাসে আমরা বাঘ-সিংহ দেখেছি, হাতিও দেখেছি। এবার এসেছে বিড়াল। সে জানে না সংস্কার কী, নির্বাচন কী। তার কাছে লন্ডন আর ঢাকা—দুটোই শুধু নিরাপদ ঘুমের ঠিকানা। অথচ আমরা তার লেজের নড়াচড়াতেও অর্থ খুঁজি, রূপক বানাই, ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করি।
জনপ্রিয় এক পোস্টে লেখা :‘নতুন রাজনীতির নতুন মুখ—নিঃশব্দে আসে, নিঃশব্দে খায়, আর সুযোগ পেলেই ঝাঁপ দেয়।’ তবে আশঙ্কাও আছে। যদি কোনো জনসভায় বিড়ালটি মাইকের ওপর থাবা মারে, সেটা কি ‘বাক্স্বাধীনতা হরণ’? নাকি সেটাই হবে সবচেয়ে সত্ রাজনৈতিক বক্তব্য—নীরব, কিন্তু অর্থবহ?
রাজনীতির ইতিহাসে আমরা বাঘ দেখেছি, সিংহ দেখেছি, হাতি দেখেছি। কিন্তু এবার এসেছে বিড়াল। সে ছোট, সে তুলতুলে, কিন্তু তার উপস্থিতি বিশাল। সে জানে না সংস্কার কী, নির্বাচন কী, তত্ত্বাবধায়ক কী। তার কাছে লন্ডন আর ঢাকা—দুটোই কেবল নিরাপদ ঘুমের ঠিকানা।
কিন্তু আমরা তো বাঙালি। আমরা বিড়ালের লেজের নড়াচড়াতেও ষড়যন্ত্র খুঁজি। তবু স্বীকার করতেই হবে—এই বিড়ালের আগমন আমাদের তেতো রাজনীতিতে এক চিমটি লবণের মতো। প্রতিদিনের টক-ঝাল-মিষ্টি গালাগাল আর ফাঁপা প্রতিশ্রুতির ভিড়ে সে এসে মনে করিয়ে দিল—রাজনীতি যতই সিরিয়াস হোক, আমাদের বিনোদনের তীব্র অভাব রয়েছে।
এই বিড়াল হয়তো এখনো নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সে জানে না—এই দেশের রাজনীতিতে সে এখন সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে সরব এক প্রতীক।













