আমাদের মতো সাদামাটা উন্নয়নশীল দেশের পারিবারিক কাঠামোতে শ্বশুরবাড়ি শুধু একটি নতুন ঠিকানা নয়; বরং এটি একজন নারীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের অবতারণা। বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী যখন নতুন পরিবারে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কেবল একজন পুত্রবধূ হিসেবেই নন, অধিকন্তু একজন ‘মানুষ’ হিসেবেও নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম শুরু করেন। একইভাবে, শ্বশুর-শাশুড়ির জন্যও এটি নতুন একজন সদস্যকে আপন করে নেওয়ার এক মহা পরীক্ষা!
আমাদের সমাজে শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক নিয়ে নানা নেতিবাচক গল্প প্রচলিত আছে। কোথাও পুত্রবধূকে ‘পরিবারের বাইরের মানুষ’ হিসেবে দেখা হয়, আবার কোথাও শ্বশুর-শাশুড়িকে অপ্রয়োজনীয় বা বোঝা মনে করা হয়। অথচ একটি সুস্থ পরিবারের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার ওপর।
একজন পুত্রবধূর উচিত, শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের বাবা-মায়ের মতো সম্মান করা। তাঁদের অভিজ্ঞতা, বয়স ও জীবনের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু ভাষা ও আচরণে যেন শালীনতা বজায় থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধৈর্য, সহনশীলতা ও আন্তরিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, আজকের পুত্রবধূ একদিন শাশুড়ি হবেন, আর আজকের শাশুড়িও একসময় ছিলেন কারও না কারো পুত্রবধূ। প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু সম্পর্কের মৌলিক চাহিদা বদলায় না—মানুষ চায় সম্মান, ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা
অন্যদিকে, শ্বশুর-শাশুড়িরও উচিত, পুত্রবধূকে কেবল ‘বাড়ির বউ’ হিসেবে নয়, বরং একজন ‘স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা। তাঁর শিক্ষা, মতামত, পছন্দ-অপছন্দ ও ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখানো। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁকে সময় দেওয়া এবং তাঁর ভুলত্রুটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা মানবিকতার পরিচয় বহন করে।
অনেক সময় পারিবারিক দ্বন্দ্বের মূল কারণ হয় ভুল বোঝাবুঝি ও অহংবোধ। একটি ছোট সমস্যা যেখানে আলোচনার মাধ্যমে তুড়ি মেরে সমাধান করা যায়, সেখানে পারষ্পারিক ভুল বোঝাবুঝি কিংবা নীরবতা বা কটূক্তি সেই ছোট্ট সমস্যাকে জটিল করে তুলতে পারে। এজন্য অভিযোগ নয়, সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, আজকের পুত্রবধূ একদিন শাশুড়ি হবেন, আর আজকের শাশুড়িও একসময় ছিলেন কারও না কারো পুত্রবধূ। প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু সম্পর্কের মৌলিক চাহিদা বদলায় না—মানুষ চায় সম্মান, ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা।
একটি আদর্শ পরিবার তখনই গড়ে ওঠে, যখন সেখানে কর্তৃত্বের পরিবর্তে সহযোগিতা, অবজ্ঞার পরিবর্তে সহমর্মিতা এবং সন্দেহের পরিবর্তে বিশ্বাসের চর্চা হয়। পুত্রবধূ ও শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পর্ক যদি প্রতিযোগিতার না হয়ে বরং পরিপূরকতার হয়, তাহলে সেই পরিবার হয়ে উঠবে শান্তির নীড় এবং এতে করে সমাজ পাবে সুস্থ মূল্যবোধের ভিত্তি।
আমরা যেন ভুলে না যাই, পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যদি সম্মান ও মানবিকতার চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তার ইতিবাচক প্রভাব গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। আর পরিবারে মূল্যবোধের ঘাটতি মানেই পতন অনবিার্য ! সুতরাং, আমরা যেন সম্পর্ককে জয় করার চেষ্টা করি; মানুষকে নয়, হৃদয়কে আপন করার শিক্ষা গ্রহণ করি। সর্বোপরি, মানুষ হিসেবেই অন্য মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত এবং সেটা সব মানুষের প্রতি। বাংলার প্রতিটি পরিবার সুস্থ সম্পর্কের চর্চাকেন্দ্র হয়ে উঠুক।
লেখক : সাংবাদিক













