সাম্প্রতিক প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে দেশ জুড়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও উদ্বেগ লক্ষ করা গিয়েছে। কেউ একে শিক্ষাব্যবস্থার ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন, কেউ বলছেন এটি কেবল একটি গণপরীক্ষার ফলাফল নয়, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অদৃশ্য অন্তর্দাহের বহিঃপ্রকাশ। এই ফলাফল কোনো দুর্ভাগ্যজনিত ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাদর্শন, যান্ত্রিক পরীক্ষানির্ভরতা ও গুণগত অবক্ষয়ের স্বাভাবিক ফলাফল। তাই জিজ্ঞাস্য কেবল এতটুকু নয় যে, এইচএসসি পরীক্ষায় কারা পাশ করল, কারা ফেল করল। বরং এর চেয়েও গভীরভাবে ভাবনার বিষয় হলো : পরীক্ষার ফলাফলই কি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য?
পরীক্ষার ফলাফলকেন্দ্রিক সব প্রচেষ্টা আমাদের শিক্ষার সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত ও সাধারণ শিক্ষার ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের মধ্যেই এর শেকড় নিহিত আছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে এখন ‘পরীক্ষা’ নামের এক অতিশক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই শিক্ষার মান, ছাত্রের যোগ্যতা, শিক্ষকতার সাফল্য, এমনকি একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাও নির্ধারিত হচ্ছে পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি কোথা থেকে ও কীভাবে এলো? উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ভারতবর্ষে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল, তার উদ্দেশ্য কখনোই রাষ্ট্রের জন্য স্বাধীনচেতা চিন্তাশীল নাগরিক তৈরি করা ছিল না; বরং সেটা ছিল ‘লিখতে-পড়তে জানা’ এমন এক তাঁবেদার শ্রেণির আমলা বা কেরানিদের তৈরি করা, যারা শাসনযন্ত্রের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করবে। টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে তার বিখ্যাত ‘মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’-এ বলেছিলেন, ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য ‘এমন একটি শ্রেণি তৈরি করতে হবে, যারা হবে রক্তমাংসে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তাচেতনায় ও মূল্যবোধে ব্রিটিশ’। দুঃখজনকভাবে আমরা দুই বার স্বাধীনতা অর্জনের পরও শিক্ষাব্যবস্থার সেই ঔপনিবেশিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেছি। এখনো আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য মানবিক নাগরিক নয়, বরং পরীক্ষায় উচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ‘চাকরিপ্রার্থী’ আমলা কিংবা কেরানি তৈরি করা আর পরীক্ষার ফলাফলই যাদের যোগ্যতার মাপকাঠি।
পরীক্ষার ফলাফলের জন্য উচ্ছ্বাসের আড়ালে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ও আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না। প্রতি বছরই বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন দেশে যেন এক উত্সবের দিন হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমে বড় শিরোনাম ‘অমুক বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে’, ‘ফলাফল ভালো, পাশের হার ৯০ শতাংশের বেশি’। কিন্তু এ উচ্ছ্বাসের আড়ালে থেকে যায় তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যর্থতার গভীর এক বাস্তবতা। এই ফলাফল আসলে আমাদেরকে কী বলছে? এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ‘ফলাফল বিপর্যয়’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু সংখ্যায় নয়, শিক্ষার গুণমানেও আমরা ভয়াবহভাবে পিছিয়ে গিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেও বাস্তবে তারা বিষয়বস্তুর গভীরতা বোঝে না। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, ‘শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে পাশ করে, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারে না।’ এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই নিজেদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে আত্মবিশ্বাসী নয়। অথচ টিউটরিং, কোচিং, গাইড বই ও মডেল টেস্টের দৌলতে তারা ভালো ফল করছে। ফলে পরীক্ষায় সফলতা এখন বাস্তব জ্ঞানের নয়, বরং কৌশলে নাম্বার অর্জনের বা মুখস্থবিদ্যার দক্ষতার পরিমাপক।
ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অত্যাচারিতের শিক্ষা’ (প্যাডাগোজি অব দ্য অপ্রেসড)-এ বলেছিলেন, ‘যে শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায় না, তা হলো দমনমূলক শিক্ষা’। আমাদের শিক্ষা এখন সেই দমনমূলক প্রথায় বন্দি, যেখানে শিক্ষার্থী কেবল তথ্যগ্রহণকারী, চিন্তাশীল সত্তা নয়।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোভিড-পরবর্তী শিক্ষার পটভূমি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থার আশু সংস্কার ও রূপান্তর অত্যাবশ্যক। কোভিড মহামারি বিশ্ব জুড়ে শিক্ষার চেহারা পালটে দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির উত্কর্ষের এই যুগে শিক্ষার্থীরা বই থেকে নয়, ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জ্ঞান আহরণ করছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারকরা এই পরিবর্তন এখনো উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মনে হচ্ছে। ফলে পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষার কাঠামো এখনো সেই পুরোনো রূপেই চলছে, যেখানে শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবন ও প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাভাবনা কিংবা অভ্যাসের কোনো প্রতিফলন নেই। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শিক্ষার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা উভয়ই। কিন্তু আমরা এখনো তার কোনো সুশৃঙ্খল ব্যবহার বা নৈতিক দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারিনি।
আমরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, সে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের নাগরিকদের তৈরি করতে ফলাফল নয়, প্রয়োজন শিক্ষার পুনর্গঠন ও যুগোপযোগী রূপান্তর। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের এইচএসসি ফলাফল আসলে এক প্রকার ‘সতর্কবার্তা’। যদি আমরা এখনই আমাদের শিক্ষার ভিত্তিকে পুনর্গঠন না করি, তবে ভবিষ্যতে আরো বড় বিপর্যয় আসবে। শিক্ষার উদ্দেশ্যকে কেবল ‘পরীক্ষা পাশ’ বা ‘চাকরি পাওয়া’র গণ্ডি থেকে বের করে এনে মানুষ গড়ার সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। এজন্য দরকার একটি নতুন শিক্ষাদর্শন, প্রাসঙ্গিক শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি—যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক সুতোয় গাঁথা থাকবে।
রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষার দর্শনকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদরা তাই সর্বদাই বলে এসেছেন, শিক্ষা হলো জীবনবোধের অনুশীলন। কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘শিক্ষা মানুষকে নিজের ভুল চিনতে শেখায়’। প্রকৃত অর্থে শিক্ষা কোনো পাত্রে তথ্য ঢালা নয়; বরং মননের আগুন প্রজ্বলিত করা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ হয়ে ওঠার সেই আগুন এখন নিভে আসছে। আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল তথ্য, উপাত্ত কিংবা তত্ত্ব ঢালছি, কিন্তু তাদের মধ্যে চিন্তার আগুন জ্বালাতে পারছি না।
বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে আমাদেরকে নতুন সম্ভাবনার ডাক দিতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ হওয়াটা স্বাভাবিক; তবে এটিকে আমরা কেবল হতাশার প্রতীক হিসেবে দেখলে ভুল করব। আমাদের জন্য এটি এক গভীর আত্মসমালোচনার সুযোগও এনে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে আমাদের নিজেদেরকে জিগ্যেস করার :আমরা কেমন শিক্ষার্থী চাই? কেবল পরীক্ষায় পাশ করা মানুষ, নাকি মানবিক বোধসম্পন্ন নাগরিক? আমরা কেমন শিক্ষক চাই? কেবল সিলেবাস শেষ করা কর্মচারী, নাকি চিন্তা উসকে দেওয়া দার্শনিক? আমরা কেমন সমাজ চাই? কেবল ডিগ্রিধারী কর্মজীবী, নাকি ন্যায় ও সত্যের চর্চায় বিশ্বাসী মানুষ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ শিক্ষার দিকনির্দেশ। কারণ শিক্ষা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপকরণ নয়, এটি মানবমুক্তির প্রক্রিয়াও বটে।
এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল হয়তো আপাতদৃষ্টিতে ‘বিপর্যয়’ মনে হচ্ছে, কিন্তু তা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার এক সুযোগও বটে। এটা ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’ এই আক্ষেপ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাব্যবস্থাকে জীবনমুখী যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে এবং শিক্ষার গুণমান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিশেষ আহ্বান। এখন সময় এসেছে শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার ও নতুন করে ঢেলে সাজাবার, যেখানে শেখা মানে জীবনতথ্য, উপাত্ত বা তত্ত্বের বোঝা নয়, কেবল নাম্বারের জিপিএ নয়, সঙ্গে সঙ্গে জীবনের অর্থ খোঁজাও। আমাদের শিক্ষার মানের উত্কর্ষ সাধন করতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরের মধ্যমে, যেখানে শিক্ষক মানে অনুপ্রেরণা, আর শিক্ষার্থী মানে অনুসন্ধানী মন। পরীক্ষার ফলাফল নয়, জীবনের স্বরূপ অনুসন্ধানই হবে তখন আমাদের শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। নতুন স্বপ্নের জাল বুনে আমরা সেই সুদিনের প্রতীক্ষায় রইলাম।













