জাতি গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা যে কতখানি গভীর—এ উপলব্ধি থেকেই হয়তো লিও তলস্তয় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব তাদের জীবনের অন্তিম সময় শিক্ষার কাজে উত্সর্গ করেছিলেন। তারা শুধু পাঠদানই করেননি, শিক্ষার জন্য রচনা করেছেন পাঠ্যবইও; যে আলো তারা নিজেরা পেয়েছিলেন, তা প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন।
বস্তুত, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বিশাল জটিল যন্ত্র। এতে আছে নীতিনির্ধারকেরা, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, নানাদিকের স্টেকহোল্ডার; কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে সবটা চালনা করেন যিনি—তিনি শিক্ষক। তার একাডেমিক দক্ষতা, পেশার প্রতি ভক্তি, অধ্যবসায়ের আগুন, নৈতিকতার দৃঢ়তা—এসবের যে কোনো একটি দুর্বল হলে পুরো যন্ত্রটাই কেঁপে ওঠে। যেন সেতারের সব তার ঠিক তান করা, শুধু একটি যদি ঢিলা হয়—সুর ভেঙে যায়।
শিক্ষকের দায়িত্বের গভীরতা বুঝতে হলে একটু তাকাতে হয় মুনীর চৌধুরীর দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাত্ ক্লাস নেওয়ার অনুরোধ এলেও তিনি কখনো তা গ্রহণ করতেন না—কারণ তার কাছে পাঠদান ছিল প্রস্তুতির ধ্যানযোগ। প্রস্তুতি ছাড়া ক্লাস মানেই আলোহীন প্রদীপ। তিনি জানতেন—একটি ভালো লেকচার ছাত্রদের মাথায় শুধু তথ্য ঢালে না, মনোজগতের কাঠামোও পালটে দেয়।
শিক্ষকের নিষ্ঠার এই যে নীরব সৌন্দর্য—জাপানের এক রাতের গল্পে যেন এর প্রতীক মিলেই যায়। আলী ইমাম দেখেছিলেন—রাত ৩টা পর্যন্ত পড়ছেন এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, শুধু পরদিনের ক্লাসের প্রস্তুতিতে। এই একাগ্রতা যেন বিনা ঢাকঢোলের কবিতা—একজন শিক্ষক নিভৃতে আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন, আর সেই আলোই হয়তো আগামী দিনের বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কিংবা মানবিকতার পরম যাত্রীকে পথ দেখাবে।
শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ছাত্রকে কতখানি টানে—এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে হুমায়ূন আহমেদের জীবনে। নর্থ ডাকোটায় গবেষণায় মগ্ন তরুণ গবেষক একদিন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করা এক অধ্যাপকের ব্যক্তিত্বে এতটাই মোহাবিষ্ট হলেন যে, একাডেমিক ডিসিপ্লিন ভেঙে হলেও তার অধীনেই পিএইচডি করতে চাইলেন তিনি। এমন ব্যক্তিত্ব, এমন মাধুর্য—যে শিষ্যকে টেনে নিতে পারে শেকড়সহ—এ যেন এক অদৃশ্য মহাশক্তি।
তবে শিক্ষক মানে শুধু মেধাবী বক্তা নন—মানের শূন্যে দাঁড়ানো মানুষ। তার মানবিকতা, উদারতা, কৃতজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় তার বিস্ময়কর অরার। যেমন নোবেলজয়ী জন ক্লার্ক নিজের কৃতিত্বের চাইতে তার সহকারীদের অবদান সামনে এনেছিলেন বারবার। তাকে দেখে মনে হয়—জ্ঞান খাঁটি হয় যখন বিনয় তার সাথি হয়।
শিক্ষকের কাজ কেবল জ্ঞানের চাকা ঘোরানো নয়—অনেক সময় তাকে গল্পকার হতে হয়, মনোজগতের মায়েস্ত্রো হতে হয়। ছাত্রদের মনোযোগ যখন ভেসে যায় দূর আকাশে, তখন শিক্ষককে ডেকে আনতে হয় বাস্তবের রূপকথা। হতে পারে, তিনি শোনালেন সেই ছেলেটির গল্প—যার জন্ম হয়েছিল শরণার্থী শিবিরে, যার বাবা-মা ছিলেন অশিক্ষিত; তবুও সে লিখেছিল এমন গবেষণাপত্র, যার সাইটেশন আড়াই লাখ ছাড়াল; সেই ছেলেটিই পরে হলো নোবেলজয়ী ওমর ইয়াগি।
ছাত্ররা যখন পড়ালেখার সময় একটু কষ্টেই বিরক্ত হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষক সহজেই বলতে পারেন ইবনে সিনার কাহিনি—কোনো একটি বই তিনি বুঝতে না পেরে ৪০ বার পড়েছিলেন। এমন মনোনিবেশ, এমন অধ্যবসায়ই তো শেষমেশ জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। এসব গল্প, এসব জীবনের উদাহরণই ছাত্রদের জাগিয়ে তোলে; তাদের মধ্যে ‘আমিও পারি’ অনুভূতির ক্ষুদ্র আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
শিক্ষক তো শুধু তথ্য দেন না—মনের দরজা খুলে দেখান। পাঠ্যবই যেখানে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ বোঝাতে ব্যর্থ, সেখানে তিনি কমলার কোয়া দিয়ে পৃথিবীর বিন্যাস শেখাতে পারেন; ইতিহাস বোঝান মানচিত্রে যুদ্ধের পথরেখা এঁকে দিতে পারেন; জীববিজ্ঞানের অণুজগত্ দেখাতে পারেন ডিজিটাল অ্যানিমেশনের মাধ্যমে—যেখানে পরমাণুর ইলেকট্রনের ঘূর্ণন ধরা পড়ে ত্রিমাত্রিক আলোয়।
যে শিক্ষক ছাত্রের প্রতিভা শনাক্ত করতে পারেন—তিনি যেন ভবিষ্যতের কারিগর। তলস্তয় যখন জীবনের দিশা হারাচ্ছিলেন, তার ফুপু তাকে ফেরালেন লেখালেখির পথে। অন্যদিকে ব্রজমোহন ইনস্টিটিউট চিনে নিয়েছিল তরুণ হুমায়ুন আজাদকে। তবে কোথাও কোথাও শিক্ষকের এই আলোকিত পবিত্র দায়িত্বের দেহে অমাবস্যার ছায়াও পড়ে। কেউ কেউ রাজনৈতিক সংযোগের অহংকারে, কেউ আবার ব্যক্তিগত ব্যাচে ছাত্র না এলেই বিরক্ত হয়ে পড়েন। পাঠদান তাদের কাছে পারফর্মিং আর্ট নয়—শুধু জীবিকা। শিক্ষাব্যবস্থাকে সুসংহত করতে সরকারের করণীয়ও কম নয়। প্রত্যেক পাঠ্যবইয়ের জন্য মানসম্মত ডিজিটাল পাঠ প্রকাশ করা গেলে সারা দেশে ব্যাখ্যার মান হবে সমান। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের মতো দৃষ্টিনির্ভর বিষয়ে—ডিজিটাল উপস্থাপনার শক্তি অনস্বীকার্য।
অন্যদিকে শিক্ষকদের বাণিজ্যিক মানসিকতা রোধে প্রয়োজন যৌথ পরীক্ষা, উত্তরপত্র বিনিময়, এবং কঠোর মূল্যায়ন। ভালো শিক্ষককে সম্মান দিতে হবে—যেমন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম ক্যামব্রিজের আকাশ ছেড়ে চট্টগ্রামের মাটিতে নেমে এসেছিলেন মাত্র ৩ হাজার টাকার বেতনে, শুধু এ দেশের জ্ঞানভুবন গড়ে তোলার জন্য। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উচ্চতর তাত্ত্বিক গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। তিনি যে গবেষণার ক্ষেত্র অসম্পূর্ণ রেখে গিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে সেই একই বিষয়ে গবেষণা করে বিদেশের একজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পান।
মেধাবী শিক্ষার্থী খুঁজে বের করা জরুরি, তাই বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের জন্য ভর্তির পরীক্ষা থাকা উচিত—এ যেন ভবিষ্যতের তারাগুলোকে খুঁজে পাওয়ার প্রথম ছাঁকনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন কঠোর মাঠসমীক্ষা, যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়—যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের সুফল পায়। মাদ্রাসা শিক্ষাকেও যুগোপযোগী করতে হবে। প্রথম ১৫০ বছর মাদ্রাসার অধিপতি ছিলেন ব্রিটিশরা, পাঠ্যসূচিও ছিল তাদের তৈরি। সেই পুরোনো পাঠ্যসূচি আজও বহাল। তাই সিলেবাসকে নতুন করে বিন্যাস করা দরকার—যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী। পাশাপাশি মাদ্রাসায় বৃত্তিমূলক দক্ষতা শিক্ষা, প্রযুক্তিভিত্তিক পাঠ, ভাষাজ্ঞান ও কর্মমুখী কৌশল শেখানো জরুরি।
যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমঘন শিল্পে বিপুল পরিবর্তন আনছে—অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন—তাই ভবিষ্যতের কাজের বাজারে কীভাবে আমরা নিজেদের উপযোগী করে তুলতে পারি, সে বিষয়ে গবেষণা অপরিহার্য। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিই বাংলাদেশের মুক্তির পথ।
এরই ভেতর দাঁড়িয়ে মনে পড়ে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট লিগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হেগ স্টর্মের শেষ ইচ্ছার কথা। মৃত্যুর আগে তিনি তার সন্তানদের বলেছিলেন—তার সমাধি কোনো আড়ম্বর দিয়ে ঢেকে দেবে না। কফিন তারা নিজেরাই বহন করবে। আর কবরস্থ করার সময় তারা স্মরণ করবে—বাংলাদেশ নামে এক দেশ আছে, সেই দেশের দুঃখী মানুষদের। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সেই মানুষের দুর্দশা তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন—সামান্য সাহায্য নিয়ে ছুটে গিয়েও তাদের রক্ষা করতে না পারার ব্যথা তিনি সারা জীবন ভুলতে পারেননি।
সেই দুঃখী মানুষের ভাগ্য বদলানোর দায় এখন আমাদের—শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, শিক্ষা ব্যবস্থাপকদের এবং প্রতিটি বিবেকবান শিক্ষকের। যথার্থ শিক্ষা যদি দিতে পারি, দক্ষ মানবসম্পদ যদি গড়ে তুলতে পারি—তাহলেই বাংলাদেশের দুঃখ কেটে যাবে।
আমরা বিশ্বাস করি—আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে সেই আলোকিত দেশ, যেখানে শিক্ষা শুধু চাকরির সোপান নয়—মানুষ গড়ার মহাসাধনা। যেখানে একটি শিশুর মন থেকে দুঃখের গোধূলি মুছে যাবে, আর তার স্থলে উঠবে ভোরের উজ্জ্বল সূর্য। সেই ভোরই আমাদের ভবিষ্যত্—সেই ভোরই আমাদের বাংলাদেশ।













