বাংলাদেশের রাজনীতি অত্যন্ত জটিল। তাই রাজনীতি এবং নির্বাচন নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা সত্যিই কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এ দেশের রাজনীতি এতটাই অনিশ্চিত যে, কখন কী ঘটে যায়, তা আগে থেকে ধারণা করা যায় না। অধিকাংশ সময়ই দেখা যায়, আমি যা ধারণা করিনি, বাস্তবে তা-ই ঘটেছে। আবার কোনো কোনো সময় যা ধারণা করি, তা ঘটে না। কাজেই দেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতি বা নির্বাচন নিয়ে আমি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে চাই না। তবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং পরে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হতে পারে, তা নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। বিশেষ করে, আমি অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিই দৃষ্টি দিতে চাই।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দিন ধরেই নানা কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এসব চ্যালেঞ্জ কমেনি বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেড়েছে। করোনাকালীন থেকেই আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার মন্থর হয়ে পড়ে। সেটাই এখনো অব্যাহত রয়েছে। বরং প্রবৃদ্ধির ধারা আরো বেশি পরিমাণে মন্থর হয়ে পড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার কমে গেছে। ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার বিগত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তারা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছেন। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তারা নতুন বিনিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি বর্ধিত মাত্রায় বিনিয়োগ না করেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সেই দেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী হন না। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে। এ ধরনের একটি অবস্থায়, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মতো বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও একটি রাজনৈতিক সরকারের জন্য অপেক্ষা করছেন। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে বলে মনে হয় না। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ প্রত্যাশা করা যায় না।
অর্থনীতির একটি ভালো খবর হচ্ছে, আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট কিছুটা ভালো হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অনেকটাই বাজারভিত্তিক করা সম্ভব হয়েছে। রেমিট্যান্স আহরণের হার বেড়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদের হার এখন রয়েছে উচ্চ পর্যায়ে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি বলেই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ সেভাবে হচ্ছে না। এজন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেটা করা হলে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরো বাড়তে পারে।
আমরা সমস্যার মূলে হাত দিতে চাই না। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ঋণগ্রহীতা সবাই চায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমে আসুক, কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই! কস্ট অব ফান্ড বেশি হওয়ার কারণে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ছে না। এই সেক্টরে জমে থাকা পর্বতপ্রমাণ খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা এক্ষেত্রে প্রধানত দায়ী। আর এ কারণে প্রথমেই খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আমরা কী সেটা করছি?
দেশের অধিকাংশ ব্যাংক বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সংকটে ভুগছে। ইচ্ছে থাকলেও তারা উদ্যোক্তাদের চাহিদামতো ঋণ দিতে পারছে না। বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সংকট নিরসনের জন্য ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। উচ্চ সুদে সংগৃহীত আমানকৃত অর্থ নিশ্চয়ই ব্যাংক কম সুদে বিনিয়োগ করতে পারবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আইনি সংস্কারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণকে আড়াল করে রাখার একটি প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট জমাদান সাপেক্ষে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃ তপশিলিকরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সরকারের সেই উদ্যোগ নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়। কিছু দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে আবারও ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট প্রদান সাপেক্ষে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃ তপশিলিকরণের সুযোগ দিয়েছে। এবার গ্রেস পিরিয়ডের মেয়াদ এক বছরের পরিবর্তে দুই বছর করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ কার স্বার্থে গ্রহণ করা হলো?
অনেকেই মনে করছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওবার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঋণখেলাপিদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করে কখনোই ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো যাবে না। ঋণখেলাপিদের নানাভাবে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলেও যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন, তাদের কোনো সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। এটা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। এসব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
আর সরকার চাইছে, নির্বাচনের আগে খেলাপি ঋণের হার একটু কমিয়ে দেখানোর জন্য! বৃহত্ ঋণখেলাপিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা তাদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত করতে পারেন। বৃহত্ ঋণখেলাপিরা জানেন, তারা বিপদে পড়লে সরকার তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের উদ্যোগ খেলাপি ঋণ সমস্যা কমানোর পরিবর্তে বরং আরো বাড়িয়ে দেবে।
এরপর আসছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা শুরু হয়। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি পলিসি রেট বাড়ানোর মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট বারবার বৃদ্ধি করলেও ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদ হার অনেক দিন পর্যন্ত ৯ শতাংশে ফিক্সড করে রেখেছিল। এমনকি এক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির হার ব্যাংক ঋণের সুদের হারের চেয়ে উচ্চ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ তুলনামূলক সস্তা হয়ে পড়ে। ব্যাংকগুলো ঋণ সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ভিন্ন খাতে ব্যবহার করে। এমনকি বিদেশে পাচার করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি না কমে বরং আরো বেড়েছে। ব্যাংক ঋণের এহেন সুদের হার অথবা মুদ্রানীতি দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাপ্লাই চেইনগুলো ঠিক করতে হবে। বাজারে তত্পর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দমন করতে হবে।
সমস্যাগ্রস্ত দেশ শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার একসময় ৭৫ শতাংশের ওপরে চলে গিয়েছিল। তারা নানা ধরনের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের মূল্যস্ফীতির হার ২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমরা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমানে দেশে অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে। সেই অবস্থায় মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের রাস্তা উন্মুক্ত হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের অতিমাত্রায় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সবশেষ জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য ছিলেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন জনসেবার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যাবসায়িক উন্নতি অর্জন করা।
রাজনীতি সব সময়ই জনসেবা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতি এখন রীতিমতো পেশায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতিতে অর্থ বিনিয়োগ করলে তা সুদে-আসলে উসুল করে নেওয়ার সুযোগ থাকে। অনেকেই রাজনীতিকে সহজে বিত্তবান হওয়ার পন্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন। ফলে রাজনীতি আর আগের অবস্থানে নেই। রীতিমতো ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আমি মনে করি, ব্যবসায়ীরা তাদের জায়গায় থাকবেন আর রাজনীতিবিদরা তাদের ক্ষেত্রে বিচরণ করবেন। এর ব্যত্যয় ঘটলেই সমস্যা সৃষ্টি হয়।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)
অনুলিখন : এম এ খালেক
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













