১৯৭১ সালের মার্চ মাস। সমগ্র দেশ যখন বঞ্চনা, ক্ষোভ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উত্তাল, তখন চা-বাগানবেষ্টিত শান্ত শহর শ্রীমঙ্গলও পরিণত হয় প্রতিরোধের এক সংগঠিত কেন্দ্রে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে মার্চের প্রতিটি দিন এখানে হয়ে ওঠে সংগ্রাম, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার অঙ্গীকারের দিন। ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে শ্রীমঙ্গল ধীরে ধীরে গড়ে তোলে মুক্তিযুদ্ধের সুদৃঢ় ভিত।
১৯৭১ সালের ১লা মার্চ দুপুর ১টায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের ভাষণ রেডিওতে প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা কার্যালয় থেকে ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, মো. শাহজাহান মিয়া ও সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান স্লোগান দিয়ে মিছিল শুরু করলে মুহূর্তেই শ্রীমঙ্গল শহরের চারদিক থেকে ৬-দফা ও ১১ দফা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও তাদের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের নেতৃত্বে সারা শ্রীমঙ্গল মুখরিত হয়ে ওঠে। মিছিলে স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা—জয় সমাজতন্ত্র, বিশ্বে একটা নতুন দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা, সামরিক জান্তা নিপাত যাক, ৬-দফা ও ১১ দফা জিন্দাবাদ, বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ মিছিল শেষে পৌরসভার মাঠে হাজার হাজার জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ন্যাপ ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। তখন থেকেই প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে লাঠিসোঁটাসহ জঙ্গি মিছিল চলতে থাকে। বিভিন্ন হাটবাজারে, বাগানে বাগানে, গ্রামেগঞ্জে ছাত্র-জনতার বিক্ষুব্ধ মিছিল অগ্নিরূপ ধারণ করে।
৩রা মার্চ সিলেটে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিবর্ষণে এক জন মারা গেলে মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতার ঢল সর্বত্র বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের গগনবিদারী আবেগময় ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের সৃষ্টি হয় ও তীব্ররূপ পরিগ্রহ করে।
২৩শে মার্চ শ্রীমঙ্গলের ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার রক্তরাঙা সূর্যস্নাত পতাকা উত্তোলিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন এম এ রহিম, একরাম হোসেন চৌধুরী, বিরাজ সেন তরুণ, মঈন উদ্দিন, সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান প্রমুখ। ২৪শে মার্চ মৌলভীবাজারের তত্কালীন পাঞ্জাবি এসডিপিও শ্রীমঙ্গলে এসে পুনরায় পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন করেন। ২৫শে মার্চ সংগ্রামে লিপ্ত বিদ্রোহী জনতা থানা ঘেরাও করে রেখে থানার ভেতরে ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান, ছাত্রলীগ নেতা একরাম হোসেন চৌধুরী থানা কর্তৃপক্ষের সামনে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে দিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা পুনরোত্তোলন করেন। এ সময় থানায় উপস্থিত জনতার রুদ্ররোষের মুখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য অবলোকন করে। ২৭শে মাঠ রাতে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম থানার জমাপড়া বন্দুকগুলো প্রতিরোধ সৈনিকদের হাতে তুলে দেন। প্রকাশ্য দিবালোকে স্বতঃস্ফূর্ত জনতা মহাসড়কে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে থাকে।
এদিকে গণপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াস ও মো. আলতাফুর রহমান চৌধুরী বালিশিরা ভেলী বাগান এলাকায় আত্মগোপন করে স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপারে গোপন সভায় মিলিত হন। স্থানীয় কৃষক শ্রমিক, ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের এক পর্যায়ে রাস্তার দুই ধারে বাড়িঘর, দোকানপাট ও সম্ভব হলে ইট-পাথর ভাঙা কাচখণ্ড ইত্যাদি নিয়ে জড়ো হতে থাকে। শত্রুর সেনাদের অতর্কিত আক্রমণকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে রাত ১০টার দিকে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি সংবাদ দেন যে, কিছু বাঙালি সৈনিক শমশেরনগর থেকে তাদের প্রিয়জনদের উদ্ধার করার মানসে কুমিল্লা সেনানিবাসে যাওয়ার জন্য রাস্তা করে দিতে ছাত্র-জনতা ও তরুণদের সাহায্য সহযোগিতা চান। সেজন্য তাদের সহযোগিতায় সোনালী ব্যাংক ম্যানেজার বাদশা মিয়া, শহিদুল আলম, সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান, মরহুম রিকশাচালক আনিস ও প্রাক্তন সৈনিক মুকিত লস্কর এগিয়ে আসেন। তাদের আহ্বানে সাতগাঁয়ের চা-শ্রমিকরাও সহযোগিতা করেন ও রাস্তার ওপর রাখা বড় বড় গাছগুলো কিছুক্ষণের জন্য অপসারিত হয়। ২৮শে মার্চ বিকালে সংগ্রাম পরিচালনা জন্য ফরিদ আহমদ চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে ও সদস্যপদে ডাক্তার আব্দুল আলী, মুহিবুর রহমান, কমলেশ ভট্টাচার্য, সাইয়িদ মুজীবুর রহমানকে নিয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়।
আনসার বাহিনীর ক্যাপ্টেন এম এ মুসাব্বির, ক্যাপ্টেন মতলব, এম এ রহিম, শহিদুল আলম, মো. শাহজাহান মিয়া, রাসেন্দ্র দত্ত, আব্দুর রহিম, দীপক সেন, সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান গ্রামে গঞ্জে ঘুরে আনসার, মুজাহিদ, প্রাক্তন সৈনিক জোগাড় করে গ্রামগঞ্জ ও চা-বাগানের ম্যানেজারদের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংগ্রাম কমিটির হাতে অর্পণ করেন ও কমিটির উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা স্কোয়াড গঠন করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। ২৯শে মার্চ আন্দোলনকারী জনতার মিছিলের ওপর ভৈরব বাজার নামক স্থানে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছোড়ে। এতে হরমুজ মিয়া নামক এক ব্যক্তি নিহত হয়। ৩০শে মার্চ মৌলভীবাজারে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা শ্রীমঙ্গলে আগুন লেগেছে এই অজুহাতে ফায়ার ব্রিগেডের দুটি গাড়ি প্রেরণ করে। শ্রীমঙ্গলের সংগ্রামী দামাল ছেলেরা দমকল বাহিনীর গাড়িতে এসে সেনাবাহিনীর লোক আছে সন্দেহে গাড়িটি আটক করে একটি গাড়ির ফায়ারম্যানদের তুমুল জেরা শুরু করেন। এক পর্যায়ে পেছনে আসা গাড়িটি সুযোগ বুঝে ঘুরিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে শ্রীমঙ্গলের ছাত্র ও তরুণ কর্মীরা শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল মাঠে কুচকাওয়াজ ও প্যারেডে মিলিত হয়। এ সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের মনে শ্রীমঙ্গলে হাজার হাজার ভারতীয় সেনার উপস্থিতি কল্পিত ভীতির সঞ্চার হয়।
৩১শে মার্চ গণপরিষদ সদস্য মানিক চৌধুরী শ্রীমঙ্গলে এসে স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে নির্দেশ জারি করেন। এ সময় কর্নেল (অব.) আব্দুর রব, ডাক্তার আব্দুল আলী, মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন ইপিআর জওয়ানদের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য সমবেত করেন। এ সময় আনসার বাহিনী কমান্ডার মানিক চৌধুরী ও মুকিত লস্কর শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল মাঠে উত্সাহিত তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।
মার্চের সেই দিনগুলোয় শ্রীমঙ্গল ছিল জাগ্রত চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ১লা মার্চের প্রতিবাদ মিছিল থেকে শুরু করে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার অদম্য প্রত্যয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ছাত্রসমাজ, শ্রমিক-কৃষক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সাহসিকতা শ্রীমঙ্গলকে পরিণত করেছিল প্রতিরোধের এক সুসংগঠিত দুর্গে। বৃহত্তর সিলেটের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার কন্ট্রোল রুম হিসেবে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা ভবনের ভূমিকা এই জনপদের ঐতিহাসিক মর্যাদাকে আরো উঁচুতে আসীন করেছে। মার্চের জাগরণই পরবর্তী ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রীমঙ্গলের গৌরবোজ্জ্বল অবদানের দৃঢ় ভিত্তি রচনা করে।













