বর্তমান বাংলাদেশ সীমানায় ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর যখন রেলপথ প্রবেশ করে, তখন ছিল ব্রিটিশ আমল। প্রথম আসা পথটি দর্শনা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে ক্রমান্বয়ে পোড়াদহ হয়ে চলে যায় গোয়ালন্দ ঘাটে। আজকের বাংলাদেশ তখন ব্রিটিশ ভারতের সুবিশাল বাংলা প্রদেশের অংশমাত্র, যার রাজধানী ছিল কলকাতা। ১৯১২ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল গোটা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারত তথা বাংলার রেলওয়ে গড়ে উঠেছিল কলকাতার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের উদ্দেশ্যেই।
আজকের বাংলাদেশের যশোর ও খুলনার সঙ্গে রেলপথে কলকাতার যোগাযোগ ছিল। পরে কলকাতা থেকে পোড়াদহ হয়ে শিলিগুঁড়ি অবধি তৈরি হয় রেলপথ, সে রেলপথে পড়েনি সেকালের কোনো জেলা শহর। মূল লক্ষ্যই ছিল কলকাতার সঙ্গে দার্জিলিঙের যোগাযোগ। পোড়াদহসহ উত্তরের বা পূর্বের কোনো জনপদ এবং যশোর ও খুলনার মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করত রানাঘাট-বনগাঁ হয়ে। ঢাকা থেকে কলকাতা যাওয়ার উপায় ছিল ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে গোয়ালন্দ ঘাট, সেখান থেকে ট্রেনে দর্শনা হয়ে কলকাতা। আসামসহ সিলেটেরও ট্রেনে গন্তব্য ছিল চাঁদপুর, চাঁদপুর থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ তারপর আবার যথারীতি ট্রেনে দর্শনা হয়ে কলকাতা। মোদ্দা কথা সেকালের ট্রেনের তীর্থভূমিই ছিল কলকাতা। ১৯৪৭-এর পরে আমাদের অঞ্চলে ট্রেনের সে ধারা পালটে যায়—ঢাকা হয়ে ওঠে আমাদের কেন্দ্রীয় গন্তব্য। কিন্তু চাইলেই তো দ্রুত খোল-নলচে পালটে দেওয়া যায় না। তাই হয় না ঢাকা লাকসাম কর্ড লাইন।
১৯৪৭-এর পরে ধীরগতিতে রেলসংযোগ বেড়েছে অল্প কিছু। তবে সাম্প্রতিক কাল যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, মোংলা সংযোগ আর কক্সবাজার সংযোগ আমাদের দেশের রেলওয়েতে অনেক পরিবর্তন এনেছে। এখনো গোটা বরিশাল বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, সাতক্ষীরা, মাগুরা, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও শেরপুর জেলাসমূহ রেলসংযোগবিহীন রয়েছে। মাগুরা জেলাকে রেলসংযোগে আনার কাজ চলছে। আপাতত জোরদার পরিকল্পনা সাতক্ষীরা জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে আনয়নের। ভৌগোলিকভাবে সাতক্ষীরা ১৮৮২ সাল থেকেই তত্কালীন খুলনা জেলার একটি মহকুমা হলেও অবস্থানগত কারণে কলকাতার সঙ্গে ছিল অধিকতর যোগাযোগ। ব্রিটিশ আমলে সেই ১৯৪০-এর দশকে সাতক্ষীরাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই সে আমলের কলকাতামুখী রেলওয়ের প্রভাবে পরিকল্পনা হয়েছিল সাতক্ষীরাকে বনগাঁ-যশোর সেকশনের নাভারণের সঙ্গে যুক্ত করার।
সাতক্ষীরা থেকে নাভারণের দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। নাভারণ থেকে পশ্চিম দিকে বেনাপোল বনগাঁ হয়ে ট্রেন যায় কলকাতা। উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই ব্রিটিশ পাততাড়ি গুটোয়। ১৯৫৮ সালে আবারও আলোচনায় আসে সাতক্ষীরার রেল এবং তখনো নাভারণমুখী। সে স্বপ্নও কুঁড়ি মেলেনি। এর অনেক পর আইলার আঘাতে সাতক্ষীরার ব্যাপক এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে গেলে অনুভূত হয় রেলের প্রয়োজনীয়তা। পরিকল্পনা হয় দক্ষিণে সুন্দরবনের বিপরীতে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ থেকে রেলওয়ে যাবে সাতক্ষীরা হয়ে, গন্তব্য আবারও সেই নাভারণ। সাতক্ষীরা জেলার সাতটি উপজেলার পাঁচটিই পড়বে এই রেলপথের আওতায়। অস্ট্রেলিয়ান এক কোম্পানি সম্ভাব্যও যাচাই করল। এখন শোনা যায় ভিন্ন সুর। শ্যামনগর, কালীগঞ্জ আর দেবহাটা উপজেলা বাদ। রেলপথ নাভারণ থেকে সাতক্ষীরা এসে শেষ হবে ভোমরায়। ভোমরা স্থলবন্দর। সাতক্ষীরা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে, পশ্চিমে। প্রস্তাবিত এই রেলপথ হলে আপাতদৃষ্টিতে বেনাপোল ও ভোমরা দুই স্থলবন্দর আসবে রেল যোগাযোগের আওতায়।
ভোমরাকে কি বেনাপোলের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি? নাকি ভোমরার সঙ্গে মোংলা সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করা হলে তাতে ফায়দা বেশি? আগে যখন সাতক্ষীরায় রেলপথের কথা উঠত, তখন মোংলা সমুদ্রবন্দর ছিল রেল সংযোগবিহীন। সাম্প্রতিক কালে যশোর-খুলনা সেকশনের ফুলতলা থেকে থেকে মংলা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত রেলসংযোগ স্থাপিত হয়েছে। যশোর-খুলনা সেকশনের সিঙ্গিয়া ও রূপদিয়া হতে রেলপথ হয়েছে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকার সঙ্গে। ফুলতলা-মোংলা সেকশনে মোহাম্মদনগর স্টেশন খুলনা সিটি করপোরেশনের দক্ষিণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই। মোহাম্মদনগর স্টেশনকে খুলনা শহরেরই আরেকটা স্টেশন হিসাবে গণ্য করা যায়। সাতক্ষীরা থেকে এই স্টেশনের দূরত্ব ৫৩ কিলোমিটার। নাভারণের পরিবর্তে সাতক্ষীরার সংযোগ মোহাম্মদনগরের সঙ্গে হলে জেলার সঙ্গে বিভাগীয় শহরের মিথস্ক্রিয়া বাড়বে।
প্রশাসনিক কারণেও খুলনার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ প্রয়োজন। এছাড়াও খুলনা একটি শিল্প শহর। শিল্পকারখানা আপাতত বন্ধ থাকলেও সব রাজনৈতিক দলই খুলনার শিল্পগৌরব ফিরিয়ে আনার পক্ষে। অচিরেই খুলনায় আবার শিল্প এলাকায় প্রাণচাঞ্চল্য বাড়বে। ফলে যে কোনো বিচারেই খুলনা হচ্ছে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র। তাই খুলনার সঙ্গে সাতক্ষীরার রেলসংযোগ বাড়লে আখেরে সাতক্ষীরার লাভ অনেক বেশি। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে নাভারণ হয়ে পথের দূরত্ব সামান্য একটু কম। কিন্তু সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থেকে ডুমুরিয়া সরলরেখায় রেলপথ টানলে সে দূরত্বও যাবে কমে।
ভোমরা স্থলবন্দর থেকে পশ্চিম বাংলার বসিরহাটের দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার। ভোমরা-সাতক্ষীরা-নাভারণ রেলপথ হলে মনের মধ্যে সন্দেহ উঁকি দেয় মূল ‘কানেক্টিভিটি’ ভারতের স্বার্থে কি না! নাভারণ থেকে ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে বেনাপোল স্থলবন্দর, স্থলপথে ভারতে আমদানি-রপ্তানি ও পর্যটক চলাচলের জন্য দেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত বন্দর। ভবিষ্যতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে ভোমরার সঙ্গে বসিরহাটের রেলসংযোগ স্থাপন হবে না, এ কথা জোর গলায় বলা যায় না। তখন রেলপথটিতে ভারতীয় স্বার্থই হয়তো বড় হয়ে উঠবে।
ভোমরার সঙ্গে বেনাপোলের সংযোগের চেয়ে মংলার সংযোগ বেশ জরুরি এটা যে কেউই স্বীকার করবেন। সে কারণে রেলপথটি নাভারণমুখী না হয়ে মোহাম্মদনগরমুখী হওয়াই বাঞ্ছনীয়। রুট বদলালে কলারোয়া উপজেলা রেলসংযোগের বাইরে চলে গেলেও সাতক্ষীরার তালা ও খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা রেলওয়ে নেটওয়ার্কে আসবে। এমনকি খুলনার পাইকগাছা ও যশোরের কেশবপুরের মানুষও রেলসুবিধা নিতে পারবেন। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা চিংড়িমাছ চাষের জন্য বিখ্যাত এবং তিন জেলাই বিদেশে চিংড়ি রপ্তানি করে থাকে। রেলপথে খুলনা ও মংলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হলে তা চিংড়ি চাষে ও রপ্তানিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, যা হবে সারা দেশের জন্য লাভজনক।
সেই ব্রিটিশ আমলের ভাবধারায় কলকাতামুখী ভোমরা-সাতক্ষীরা-নাভারণ রেলপথ করার পরিবর্তে বিভাগীয় শহর, দেশের রাজধানী ও নিকটস্থ সমুদ্রবন্দরকে দ্রুত সংযোগ দিতে মুন্সীগঞ্জ-সাতক্ষীরা-মোহাম্মদনগর রেলপথ হোক। মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ হলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন সংলগ্ন মানুষগুলো দ্রুত পরিত্রাণ লাভ করতে পারবে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের প্রসার বাড়বে। ভোমরা স্থলবন্দরকে গুরুত্ব দিতে সাতক্ষীরা স্টেশনে জংশন করে ভোমরাকে রেলসংযোগে আনা যেতে পারে। ব্রিটিশ ভাবধারার কলকাতামুখিতা পরিহার করে আমাদের রেলওয়ে ঢাকামুখী হবে, এটাই আমাদের বিশ্বাস, আমাদের একান্ত চাওয়া।













