কোন প্রাণী সবচেয়ে বেশি অলস? এই প্রশ্নের উত্তরে বেশির ভাগটাই বলবে বাদুড়ের কথা। নিশাচর হওয়ায় দিনে প্রায় ১৯.৫ ঘণ্টা আরামসে সে ঘুমিয়ে কাটাতে পারে। তারপর যদি আসি অজগরের কথায়— বিরাট শরীর নিয়ে তিনিও দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঘুমান। এদিকে, বেড়াল তার তুলতুলে শরীর নিয়ে গড়ে ১৮ ঘণ্টা দেদার ঘুমিয়ে কাটায়। কিছু প্রজাতির শামুক একটানা তিন বছর পর্যন্ত ঘুমাতে পারে, যা হাইবারনেশনের একটি উদাহরণ। আবার কিছু তিমি; যেমন—হাম্পব্যাক তিমি দিনে মাত্র ৩০ মিনিট ঘুমায়; আবার কিছু ডলফিন প্রথম মাসে একেবারেই ঘুমায় না, বিশ্রাম নেয়।
সাধারণ ধারণা হচ্ছে, ঘুমের সময় অধিকাংশ প্রাণী কার্যত নিশ্চল থাকে। আর তাদের মাংসপেশি থাকে শিথিল। কিন্তু এটা কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নয়। কিছু পাখি ঘুমের মধ্যে উড়তে পর্যন্ত পারে। তবে তখন তাদের মস্তিষ্কের অর্ধেক সজাগ থাকে। কিন্তু পৃথিবীর সত্যিকারের সবচেয়ে ঘুমকাতুরে ও আলসে প্রাণীর নামটা আপনার কাছে খুব অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। তার নাম হলো— ‘কোরালা’।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিদ্রা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক জেরোম সিগেল বলেন, ঘুমের মধ্য দিয়ে প্রাণীরা বাড়তি প্রাণশক্তি ও কর্মক্ষমতা অর্জন করে। কোনো প্রাণী কম ঘুমায়, আবার কোনো প্রাণী বেশি ঘুমাতে পছন্দ করে। যেসব প্রাণী কম ক্যালরির খাবার খায়, তাদের ঘুমের পরিমাণও তুলনামূলক কম হয়ে থাকে।
তবে চলুন আজ কোন কোন প্রাণী সারা দিন কতটুকু কীভাবে ঘুমিয়ে কাটায়, জেনে আসি :
১. ডলফিন
‘ডলফিন’ একটি ‘ডলফিনিডি’ (Delphinidae) পরিবার বর্গের সদস্য। সে তার প্রায় পুরো জীবন পানিতে কাটায়। যদিও স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে তাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন গ্রহণ করতে শ্বাস নিতে হয়। ঘুমানোর সময় ডলফিনের মস্তিষ্কের অর্ধেক অংশ বিশ্রাম নেয়, বাকি অর্ধেক অংশ সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা পেতে সচল থাকে। ডলফিন ঘুমানোর সময় সাধারণত এক চোখ খোলা রেখে পানিতে কাঠের টুকরোর মতো ভেসে থাকে। বেশ পরিশ্রমী হলেও টানা পাঁচ দিন না ঘুমিয়ে থাকতে পারে ডলফিন।
২. তিমি
‘তিমি’ হলো ‘সিটাসিয়া’ (Cetacea) বর্গের অন্তর্গত জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। ডলফিনের মতো তিমিও ঘুমের সময় মস্তিষ্কের অর্ধেক অংশ নিষ্ক্রিয় করে ফেলে এবং এক চোখ খোলা রেখে ঘুমায়। স্পার্ম প্রজাতির তিমি ঘুমানোর সময় মাথা ওপরে রেখে খাড়াভাবে ঘুমায়। তবে হাম্পব্যাক প্রজাতির তিমি পানিতে স্থির হয়ে ঘুমায়। তিমির বিভিন্ন প্রজাতি মাত্র ৩০ মিনিট ঘুমায়। কারণ, বেশি ঘুমালে তিমির শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। তাই বিভিন্ন প্রজাতির তিমি জন্মের প্রথম মাসে ঘুমায় না। কী অদ্ভুত!
৩. সিন্ধুঘোটক
অনেকেই দাবি করেন, তারা যে কোনো জায়গায় ঘুমাতে পারেন। প্রাণীদের মধ্যে এই দাবি একমাত্র ‘ওয়ালরাস’ বা ‘সিন্ধুঘোটক’ করতে পারে। সিন্ধুঘোটক মূলত আর্কটিক অঞ্চলের স্তন্যপায়ী প্রাণী। বরফাচ্ছাদিত জলাধারে বাস করলেও যে কোনো জায়গায় ঘুমানোর ক্ষমতা রয়েছে প্রাণীটির। সমুদ্রের গরু হিসেবে পরিচিত এই প্রাণী ভাসমান অবস্থায় ঘুমানোর পাশাপাশি সমুদ্রতটে শুয়ে বা বরফের ওপরও ঘুমাতে পারে।
৪. ব্যাঙ
আমাদের গ্রহের সব ধরনের পরিবেশে ব্যাঙ দেখা যায়। শীতকালে ঘুমের কৌশল হিসেবে চিরনিদ্রা বা হাইবারনেশন কৌশল অনুসরণ করে ব্যাঙ। ব্যাঙের ঘুম বেশ রহস্যময় বিষয় বটে! ব্যাঙ আসলে ঘুমায়, নাকি নিস্তেজ হয়ে থাকে, তা নিয়ে নানা গবেষণা চলছে। নিকটাটিং মেমব্রেন নামে চোখের পাতা দিয়ে চোখ ঢেকে রাখে ব্যাঙ। যা আজব বটেই!
৫. কোয়ালা
আপনি যদি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম অলস ব্যক্তি বলে মনে করেন, তাহলে আপনি ঘুমেই আছেন মহাশয়। জেগে উঠুন! এই পৃথিবীর সবচেয়ে অলসশিরোমণি হলো ‘কোয়ালা’ বা ‘মারসুপিয়াল’ (Marsupial) গোত্রের প্রাণী, যা ‘ক্যাঙ্গারু’ ও ‘ওপোসামের’ সমগোত্রীয় এবং Phascolarctidae নামক পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য। এরা দেখতে ভালুকের মতো হলেও আসলে ভালুক নয়, বরং থলিযুক্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী যা অস্ট্রেলিয়ায় বাস করে এবং ‘ইউক্যালিপটাস পাতা’ খেয়ে জীবনধারণ করে।
কোয়ালা দিনের ২২ ঘণ্টাই ঘুমিয়ে কাটায়। সারা দিনের মাত্র দুই ঘণ্টা এরা জেগে থাকে। এই দুই ঘণ্টার মধ্যেই এরা খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা সব শেষ করে। অর্থাত্ দিনের ৯৯ শতাংশ সময় কোয়ালা ব্যয় করে ঘুম ও খাওয়ার জন্য। সাধারণত, তৃণভোজী প্রাণীরা মাংসাশীদের চেয়ে কম ঘুমায়। কারণ জাবর কাটতে তাদের অনেক সময় লাগে। বন্য প্রাণীদের নিদ্রাভ্যাস নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো নানা ধরনের গবেষণা করে চলছেন। ভবিষ্যতে আমরা আরো বিচিত্র রকমের তথ্য পাব বলেই আশা করি!













