বই, কেতাব ও শাস্ত্রমতে ‘ন্যায়’ শব্দের অর্থ হলো সঠিকতা, ন্যায্যতা, সমতা, ন্যায়বিচার, যুক্তি, নীতি, সুবচন, বা আইনসম্মত পদ্ধতি, যা সাধারণত ভালো ও কল্যাণকর কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর বিপরীত হলো ‘অন্যায্য’। বিভিন্ন প্রসঙ্গে ‘ন্যায়’-এর অর্থ নানা রকম। সাধারণ অর্থে বোঝায় যা ন্যায্য, উচিত বা সঠিক (যেমন : ন্যায়বিচার করা, ন্যায়পরায়ণ)। আইনি বা দার্শনিক অর্থে ন্যায় একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, নিয়ম, বা যুক্তি (যেমন : ন্যায়শাস্ত্র)। আবার নৈতিক অর্থে ভালো ও মানুষের জন্য কল্যাণকর কাজ (যেমন : সত্য কথা বলা, সৎ পথে চলা)। সর্বোপরি সংস্কৃত ব্যুত্পত্তি অনুসারে ন্যায় সেটাই, ‘যা পথ দেখায়’।
কিন্তু বাস্তবে আমরা কী বোধ করি? আমরা বোধ করি আমি যা ভাবছি তাই-ই ন্যায়, আমার ইচ্ছা সাধন হলেই ন্যায়, আমার স্বার্থ পূরণ হলেই ন্যায়। আর তার যা বিপরীত, তা সবই অন্যায়। এরকম ন্যায়-অন্যায়ের জটিলতায় পড়েছি কয়েক দিন আগে। কবিগুরু বলেছিলেন ন্যায়-অন্যায় জানি নে, জানি নে, জানি নে, শুধু তোমারে জানি ওগো সুন্দরী, আমি জটিলতায় পড়েছি ওগো ‘সম্পত্তি’-তে।
দীর্ঘদিন প্রকল্প পরিচালক ছিলাম জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন প্রকল্পের। হাতে লেখা জন্মনিবন্ধন থেকে অনলাইনে উত্তরণে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি জন্মতারিখ অপরিবর্তনীয় রাখতে, বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার নামেই সন্তানের নাম নিবন্ধন করাতে। এত সব চেষ্টার বিপরীতে কর্ম করার মানুষ থাকেই। আর থাকে বলেই সৃষ্টি হয় জটিলতার। তবে যত দোষ সবই নন্দঘোষের। এক্ষেত্রে নন্দঘোষ হচ্ছে জন্মনিবন্ধন।
ভদ্রলোকের এক নিকটাত্মীয় নিঃসন্তান, গত বছর এক হাসপাতাল থেকে নবজাত এক পরিত্যক্ত ছেলে শিশুকে নিয়েছেন। পিতা-মাতার নাম জানা নেই। জন্মনিবন্ধন করার সময় বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার নাম জানা না থাকায় অজ্ঞাত না লিখে নিঃসন্তান দম্পতি নিজেদের নামে নিবন্ধন করিয়েছেন। সম্প্রতি সেই কাগুজে পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতা জীবিত, কয়েক জন ভাইবোনও আছেন। সম্পত্তির প্রায় সবই পিতার নামে। সংকট বেধেছে মৃত ব্যক্তির নিজনামীয় বিঘা দুই জমি নিয়ে। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ত্রিশোর্ধ্ব তরুণী। বিধবা তরুণীর দাবি এই সম্পত্তি নিয়ে তিনি তার নিবন্ধিত পুত্রসহ পৃথক হয়ে যাবেন, পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন।
জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী সন্তান যেহেতু মৃত ব্যক্তির, তাই বিধবার দাবি ঐ সম্পত্তির ওপর ষোলোআনা হক বিধবা ও এই ছেলেশিশুর। গ্রামের মানুষ জীবন দিতে রাজি, তবু জমি নয়। ফরায়েজ অনুসারে অসত্য জন্মনিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে ঐ সম্পত্তিতে বিধবার প্রাপ্যতা দুই আনা, কথিত পুত্র ১৩/২৪ এবং মৃত ব্যক্তির পিতা ও মাতা উভয়ে ৪/২৪ বা ১/৬ অংশ করে হকদার। জন্মনিবন্ধন সনদটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারলে শিশুটি ওয়ারিশ থাকবে না। তখন ফরায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন হবে, বিধবা স্ত্রী চার আনা আর মৃত ব্যক্তির পিতা ও মাতা যথাক্রমে ৭/১২ ও ২/১২ অংশ করে পাবেন (সম্পত্তির অংশীদারত্ব Faraidh অ্যাপসে বর্ণিত মতে)।
মৃত ব্যক্তির একজন পিতৃস্থানীয় আমার শরণ হলেন। প্রশ্ন ন্যায়ের। তার দাবি এই জন্মনিবন্ধন সনদ সঠিক নয়, এই শিশু মৃত ব্যক্তির বায়োলজিক্যাল সন্তান নয়, ফলে শিশু সম্পত্তি পেতে পারে না। তারা জন্মনিবন্ধন সনদ বাতিলের ফাঁকফোকর তত্ত্বতালাশ করছেন। প্রশ্ন করলাম শিশুটি কি আপনাদের বাধ্য করেছিল তাকে পুত্র স্বীকৃতি দিয়ে জন্মনিবন্ধন করাতে? সেধেছিল আপনাদেরকে তাকে সন্তান পরিচয়ে নিতে? প্রকৃত পিতা-মাতার কাছে শিশুটি থাকলে তারা তাদের মতো করেই শিশুটিকে মানুষ করত। ভদ্রলোক জানালেন প্রকৃত পিতা-মাতাকে খু্ঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর শিশুটির দায়িত্ব নিত।
কাগুজে পিতা অকালে মৃত্যুবরণ না করে আরো বছর পঁচিশ-ত্রিশ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে শিশুটি এই পরিবারে নিজেদের মানুষ হিসেবেই বেড়ে উঠত। শিশুটি কাগুজে পিতা-মাতাকে নিজ পিতা-মাতা জ্ঞানে বড় হতো। তারপর পরিণত বয়সে সম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্বের প্রশ্নে কেউ হয়তো উন্মোচন করত জন্মবৃত্তান্ত। একজন পরিণত মানুষ হঠাত্ করে জানতে পারত তার জন্মতথ্য মিথ্যা, তার পরিচয় মিথ্যা। তখন হয়তো তার পরিবার থাকত, সন্তান থাকত, সমাজে প্রতিষ্ঠা থাকত। মিথ্যা পরিচয় প্রকাশিত হলে তখন কী নিদারুণভাবে ভেঙে পড়ত শিশুটি; যেমন করে আড়াই হাজার বছর আগে ভেঙে পড়েছিলেন রাজা ইডিপাস? মিথ্যা জন্মপরিচয়কে ধারণ করায় ইতিহাসে ঘটেছিল এক মহাবিয়োগান্তক ঘটনা।
জীবনপ্রবাহের কোনো ঘটনাই আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সাময়িক আবেগে আমরা যা করি, তার ফল, তার ধারাবাহিকতা পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত প্রভাব ফেলে। সক্রেটিস, আর্কিমিডিস, যিশু বা গ্যালিলিওর স্বাভাবিক জীবনলাভ হলে হয়তো আজকের পৃথিবী অন্যরকম হতো। আমাদের সাময়িক আবেগ পৃথিবীর গতিপথকেই বদলে দেয়। যেমনটি ঘটতে যাচ্ছে এই শিশুর ভাগ্যে। কাগুজে পিতার মৃত্যু না হলে ভবিষ্যতে একরকম ইতিহাস রচিত হতো। কাগুজে পিতার মৃত্যুতে এক বত্সরের শিশু এখন অস্তিত্বসংকটের সম্মুখীন। অথচ মৃত ব্যক্তি যদি শিশুটির পিতৃত্ব হরণ না করে ১৮৯০ সালের ‘দ্য গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট’ অনুসারে অভিভাবকত্ব গ্রহণ করতেন, তাহলে এই শিশু আজ অস্তিত্বের সংকটে না-ও পড়তে পারত। সেখানেও হ্যাপা, পালিত পরিবারের কোনো সম্পত্তিতে হিস্যা বর্তাত না। নিঃসন্তান দম্পতির সন্তানস্নেহে কাউকে মানুষ করে তুললেও তাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্বের কোনো বিধানই নেই।
যে শিশুকে নিয়ে এই নিবন্ধের অবতারণা, তার কী হবে না হবে, সম্পত্তির বিভাজন কীভাবে হবে না হবে, তা নিয়ে কোনো মত দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। সেসব রইল ভবিতব্যের হাতে তোলা আর মৃত ব্যক্তির পরিবার-পরিজনের মনমানসিকতার ওপর। আমার ভাবনা জন্মনিবন্ধন নিয়ে। আগেও যেমনটা বলেছি এখনো তেমনি বলি, জন্মনিবন্ধন হোক শতভাগ সততার ভিত্তিতে। তথ্য তো মোটে কয়েকটা। নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান ও ঠিকানা। আমাদের কেন যেন সঠিক জন্মতারিখ না দেওয়ার একটা সমষ্টিগত প্রবণতা রয়ে গেছে। জন্মতারিখ কমানো-বাড়ানোর এই খেলার শেষ দরকার। ধারণা ছিল প্রকৃত পিতা-মাতার নাম না পেলে সে স্থলে অজ্ঞাত লিখে নিবন্ধন হবে। প্রকৃত পিতা-মাতার স্থলে অন্য নামের সংযুক্তি বড় বড় শহরের নিবন্ধকের নজর এড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও গ্রামে কীভাবে নিবন্ধকের নজর এড়ালো? আবেদনে তো স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের প্রতিবেদন প্রয়োজন। যদি চোখ বুজে প্রতিবেদনে সই-ই করে দিলে হয়, তাহলে তার প্রতিবেদনের প্রয়োজন কেন? এই ধরনের তথ্যবিভ্রাট যাতে নাহয়, সে কারণেই রাখা হয়েছে এই তদন্তের বিধান।
শিশুর জন্মনিবন্ধন বলেই বিষয়টি শিশুতোষ নয়। শতভাগ সঠিক জন্মনিবন্ধনের পথ ধরে এগোলে কয়েক প্রজন্ম পরে আমাদের ভবিষ্যত্ মাথা উঁচু করে বলতে পারবে, আমরা সৎ ও ন্যায়ের পথে চলি। অন্যথায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের তৈরি করা ফাঁকিতে আমরাই ফাঁদে পড়ে যাব, বুক ফুলিয়ে ন্যায্যতার কথা বলতে পারব না।













