সম্প্রতি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩৭ আসনে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অধিকাংশ জেলাতেই ঘোষিত প্রার্থীদের পক্ষে আনন্দ মিছিল হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তবে কোনো কোনো জেলায় মনোনয়নবঞ্চিত সংক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। দু-এক জেলায় কিছু ভাঙচুরও হয়েছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অবশ্য বাংলাদেশের রাজনীতির অতীত ঐতিহ্য বিবেচনায় এ ধরনের বিক্ষোভকে ‘নির্বাচনকালীন স্বাভাবিকতা’ বলেই ভাবছেন অনেকে।
এদিকে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই জোরেশোরেই মাঠে নেমে গেছেন। প্রতিদিনই তারা জনসংযোগ, সভা করে বেড়াচ্ছেন। অন্য কোনো দল এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা না করলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু তার পরও জনমনে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা যেন কাটছেই না। সাধারণ মানুষ তো আছেনই, যারা নির্বাচন করছেন তাদের মনেও জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খাচ্ছে—আদৌ কি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে? অনেকেই আবার নির্বাচনি বাতাসের সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কাও করছেন। দিন শেষে সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে না তো—এমন আশঙ্কাও কাজ করছে কারো কারো মনে।
দীর্ঘ আট মাস ঐকমত্য কমিশন কাজ করার পর ১৭ অক্টোবর বহুল আলোচিত জুলাই সনদ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। নিবন্ধিত ৫৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৫টি দল এতে স্বাক্ষর করে। জানা যায়, ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টিই সংবিধান-সম্পর্কিত। এই ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে অন্তত ৩৬টিতে কোনো না কোনো দলের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ৮৪টি প্রস্তাবসংকলিত এই সনদের চূড়ান্ত কপিতে যেসব ইস্যুতে কোনো কোনো দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করেছে, সেসব নাকি উল্লেখ নেই। মতানৈক্যের শুরু সেখানেই। এছাড়াও এই সনদের বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে দলগুলোর মধ্যে বিপরীতমুখী অবস্থা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক অংশীদার জামায়াতে ইসলামি চাইছে জাতীয় নির্বাচনের আগেই সনদ ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠান করতে। এ ব্যাপারে তারা কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। সম্প্রতি দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের অনেকটা হুমকির সুরেই বলেছেন, ‘সোজা আঙুলে যদি ঘি না ওঠে, তাহলে আঙুল বাঁকা করব। কিন্তু ঘি আমাদের লাগবেই। সুতরাং যা বোঝাতে চাই বুঝে নিন। নো হাংকি পাংকি। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই।’ অন্যদিকে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি গণভোট ইস্যুতে এখনো দ্বিধান্বিত বলেই প্রতীয়মান হয়। একসময় তারা বলছে জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট একই দিন হওয়া আবশ্যক। অন্যসময় বলছে গণভোটের কোনো প্রয়োজনই নেই। গত ৮ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ভবনে এক আলোচনায় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্টতই বলেছেন, ‘বর্তমান সংবিধানে গণভোট করার সুযোগ নেই।’ তার ভাষায় ‘বাংলাদেশে বর্তমানে একটি সংবিধান আছে, যে সংবিধানের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এই সংবিধানে গণভোটের কোনো প্রভিশন নেই, কোনো অপশন নেই। এখন গণভোট নির্বাচনে আগে কেন, নির্বাচনের দিনও গণভোট করা এ সংবিধান গ্রহণ করবে না।’ দলটির মহাসচিব ফকরুল ইসলাম আলমগীর গত ৯ নভেম্বর ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় এক আলোচনায় এক কাঠি এগিয়ে গিয়ে বলেছেন—‘আমেরিকা থেকে কিছু লোক এসে আমাদের ওপর গণভোট ও সনদ চাপাচ্ছে।’
বর্তমান সরকারের প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের এরূপ পরস্পরবিরোধী অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানামুখী প্রশ্নের উদ্রেক করছে। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল যে, পূর্বের তিন-তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার যথাশীঘ্র সম্ভব একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন করবে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রায় ১৫ মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে, অথচ এখন পর্যন্ত নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। প্রতিবেশী নেপালে বাংলাদেশের মতো প্রায় একই রকম আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পর তাদের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। অথচ আমাদের সরকার এখনো ‘যদি’ ‘তবে’র মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে গণভোট কখন হবে, গণভোটের বিষয়বস্তু কী হবে, জুলাই সনদে বর্ণিত ভিন্নমতগুলো প্রসঙ্গে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবগুলোর আলোকে ‘জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ গ্রহণের জন্য বলা হয়। এজন্য দলগুলোকে এক সপ্তাহ সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়। সেই এক সপ্তাহও ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। উলটো এই ইস্যুতে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের হুমকি আসছে বিভিন্ন দল থেকে। সর্বশেষ ১১ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও উক্ত আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনসহ পাঁচ দফা দাবিতে রাজধানীতে আয়োজিত আট দলের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান অত্যন্ত কঠোর সুরেই বলেছেন ‘জুলাই বিপ্লবকে স্বীকৃতি দিতে হবে। জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি দিতে হলে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতেই হবে। এই আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
জানা যায়, গণভোটের দিন নির্ধারণ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় উপদেষ্টাদেরও কেউ কেউ হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকে আবার জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট করার সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন। এই অবস্থায়ই সরকার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ জারির প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়। এদিকে জামায়াত যে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে, তা কার বা কাদের বিরুদ্ধে, তা নিয়েও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ মনে করছেন, এটি অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিয়ে সাধারণ নির্বাচনের আগে গণভোট আদায়ের কৌশল। কেউ আবার মনে করছেন, আসলে জামায়াতের হুমকির মূল টার্গেট বিএনপি। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রায় সমশক্তি নিয়েই ক্রিয়াশীল থেকেছে। এখন যেহেতু আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, তাই বিএনপিকে ঘায়েল করতে পারলে জামায়াতের আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। অনেকেই একে ২০০৭ সনের ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তারা আরো মনে করেন, নির্বাচনের আগে গণভোটে সংবিধান সংশোধনী পাশ করাতে পারলে ‘সাংবিধানিকভাবেই’ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এর অর্থ জামায়াত তাদের মনপছন্দ জুলাই সনদ দিয়েই বর্তমান শাসন ব্যবস্থা বহাল রাখতে পারবে। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের ফসল ’৭২-এর সংবিধানকে ছুড়ে ফেলতে পারবে। হয়তো বিএনপিও তা বুঝতে পারছে। তাই তারা এখন জাতীয় নির্বাচনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করছে। এদিকে গত কয়দিন ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বরাতে সামাজিক মাধ্যমসমূহে নানা ধরনের গুজব ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা আরো বাড়ছে। সরকারের অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান এই অবস্থাকে আরো সংকটময় করে তুলছে। অনেকেই মনে করছেন এই সংকট যে কোনো সময় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এই অবস্থায় দেখার বিষয়—জামাতের ঘি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়; নাকি অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিতেই আটকে যায় বহুল প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন। অনেকেই মনে করেন দ্বিতীয়টির আশঙ্কাই বেশি।













