একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার অনলাইন ভার্শনে জানলাম যে, ৩০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদসম্মেলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম বলেন যে, ‘রায়েরবাজার শহিদ কবরস্থানে জুলাই শহিদদের অজ্ঞাত লাশ শনাক্তে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় একটি ল্যাব স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়’। অথচ এ অজ্ঞাত লাশ শনাক্তকরণের জন্য আধুনিক, নির্ভরযোগ্য এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ল্যাবরেটরি এবং বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশেই বিদ্যমান।
১৯৫৩ সনে জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক এবং মরিস উইলকিনস কর্তৃক মানবকোষের জেনেটিক ম্যাটারিয়াল ডিএনএর গঠন আবিষ্কার এবং ১৯৮৪ সনে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এলেস জেফরি কর্তৃক ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করার পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে বিশ্বব্যাপী অপরাধীকে শনাক্ত করার জন্য এ প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে। ১৯৬২ সনে এ কাজের জন্য তাদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ডিএনএ সব মানুষের দেহে বিদ্যমান কোষের বংশগতির বৈশিষ্ট্য বহন করে। এজন্য ডিএনএকে জেনেটিক মেটারিয়াল বা হেরিডিটারি মেটারিয়াল বলে অভিহিত করা হয়। তাদের ডিএনএর আনবিক গঠন আবিষ্কারের ফলে সব জৈবিক ধাঁধার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান করতে সাহায্য করেছিল। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মালটিসেক্টরাল প্রোগ্রামের উদ্যোগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে ২০০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি স্থাপন করা হয় দেশের প্রথম ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি।
এই ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে ডেনমার্ক সরকার। ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিকর্তৃক ফলাফলের আইনি ভিত্তি প্রদানের জন্য প্রণয়ন করা হয় ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইন, ২০১৪ এবং ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) বিধি, ২০১৮। পরবর্তীকালে সংশোধন করা হয় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং সাক্ষ্য আইন ১৮৭২। ডিএনএ আইনের ১৪(৩) ধারায় ঢাকায় অবস্থিত ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি এই আইনের অধীন সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে মর্মে বিধান করা হয়েছে। এ ল্যাবরেটরি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা, যেমন—পিতৃত্ব অথবা মাতৃত্বের প্রমাণ, বিদেশে অধিবাসী হতে ইচ্ছুকদের প্রয়োজনীয় ডিএনএ পরীক্ষা বা বংশের ধারা প্রমাণ এবং বিভিন্ন দুর্যোগ ও দুর্ঘটনায় নিখোঁজ, মৃত মানুষের পরিচিতি উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরি ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির প্রথম ধাপ। এখানে প্রাপ্ত আলামত, যেমন—মানুষের বীর্য, রক্ত বা মুখের লালা প্রভৃতি জৈবিক নমুনা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন জৈবিক নমুনা, যেমন—হাড় থেকে ডিএনএ পৃথক করার আগে হাড়কে গুঁড়া করা, টিস্যু থেকে ডিএনএ পৃথক করার আগে তাকে মিহি করে নেওয়া এবং ফরমালিনে ডোবানো টিস্যুকে ফরমালিনমুক্ত করার কাজ এ ল্যাবে করা হয়।
এক্সট্র্যাকশন ল্যাবরেটরি ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির দ্বিতীয় ধাপ। এখানে বিভিন্ন রকমের জৈবিক নমুনা; যেমন—মানুষের বীর্য, রক্ত বা মুখের লালা, টিস্যু কিংবা মানুষের হাড় বা দাঁত থেকে বিভিন্ন প্রকার এক্সট্র্যাকশন পদ্ধতির মাধ্যমে ডিএনএ পৃথক্করণের কাজ করা হয়। ডিএনএ অ্যানালাইসিস ল্যাবরেটরি ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির তৃতীয় এবং সর্বশেষ ধাপ। পৃথক্করণ এবং পরিশোধনের পর প্রাপ্ত ডিএনএকে বিভিন্ন প্রকার অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর তা বিভিন্ন প্রকার সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে অ্যানালাইসিস করা হয়। নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে সংগৃহীত নমুনার ডিএনএ প্রোফাইল অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়।
২০০৯ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় সশস্ত্র বিদ্রোহের মর্মান্তিক ঘটনায় বিডিআরের মহাপরিচালকসহ প্রায় ৭৪ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। এর মধ্যে ৫৭ জনই ছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্য। কয়েকটি মৃতদেহ চার-পাঁচ দিন মাটির নিচে অথবা পানিতে ডুবে থাকায় বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। সেনা সদর দপ্তর এই মৃতদেহগুলো শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করে। অশনাক্ত মৃতদেহ থেকে মাংসপেশির টিস্যু, দাঁত ও হাড়ের নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। নিখোঁজ সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষে তাদের নিকটাত্মীয়রা; যেমন—মা-বাবা স্ত্রী-সন্তান, অথবা ভাইবোনের রক্ত ও মুখের লালা গ্রহণ করা হয়। গৃহীত নমুনাসমূহের ডিএনএ পরীক্ষা করে তিন জন সেনা কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরা হলেন—লে, কর্নেল এলাহী মঞ্জুর চৌধুরী, কর্নেল গুলজার উদ্দিন ও মেজর আহমেদ আজিজুল হাকিম।
২০১২ সনের ২৪ নভেম্বর সাভারের আশুলিয়াস্থ তাজরীন ফ্যাশনস ফ্যাক্টরিতে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আনুমানিক ১২০ জন গার্মেন্টসকর্মী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে যেসব গার্মেন্টসকর্মীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, তাদের শনাক্ত করার জন্য ৫৯টি মৃতদেহের টিস্যু/হাড়/দাঁতের নমুনা ও তাদের আত্মীয়স্বজনের রক্তের নমুনা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত নমুনাসমূহের ডিএনএ পরীক্ষা করে মোট ৪১ জন গার্মেন্টসকর্মীর মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়।
২০১৩ সনের ২৪ এপ্রিল সাভারে অবস্থিত রানা প্লাজা ভেঙে পড়ায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৩২২ জনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি। এদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করার জন্য ৩২২টি মৃতদেহের হাড়/দাঁত/টিস্যু নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এদের বিপরীতে ৫৪০টি পরিবারের মোট ৫৫৬ জন স্বজন তাদের রক্তের নমুনা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে প্রদান করেন। পরীক্ষা শেষে মৃতদেহ বা দেহাবশেষ থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে স্বজনদের ডিএনএ প্রোফাইল তুলনা করে মোট ২০৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
তাদের শনাক্ত করার জন্য ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির (এনএফডিপিএল) উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের আওতাধীন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) কর্তৃক এনএফডিপিএলকে Combined DNA Index System (CODIS) সফটওয়্যার সরবরাহ করা হয়। যু্ক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত এফবিআইয়ের সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় এসে ডিএনএ ল্যাবের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এ সফ্টওয়ার ব্যবহার করে অল্পসময়ের মধ্যে শনাক্তকরণের কাজটি সম্পন্ন করা হয়। ২০১৩ সনের ২৬ সেপ্টেম্বর ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে সফ্টওয়ার স্থাপন এবং সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন মান্যবর রাষ্ট্রদূত ডেন ডব্লিও মজিনা। আমি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব এবং সঞ্চালনা করি।
বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নতুন ল্যাব প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির বিদ্যমান হার্ডওয়ার, সফ্টওয়ার এবং জনবল দিয়ে খুব সহজেই জুলাই বিপ্লবে নিহত অশনাক্ত শহিদদের চিহ্নিত করা সম্ভব এবং আবশ্যক। এতে সময় ও অর্থ উভয়ের সাশ্রয় হবে।













