জীবন এক নিরন্তর যাত্রা, এক অবিরাম দৌড়। এই পথচলায় যেমন আছে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, হার-জিত, তেমনি আছে আশা-নিরাশা, পাওয়া-না পাওয়ার অসংখ্য গল্প। কখনো জীবন রঙিন সূর্যের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আবার কখনো অন্ধকারের গভীরতায় হারিয়ে যায়। তবুও মানুষ থেমে থাকে না; সে ছুটে চলে নিজের স্বপ্ন, সাফল্য এবং ভবিষ্যতের সন্ধানে।
শৈশবের সেই বাধাহীন আনন্দ থেকে শুরু করে কৈশোরের রঙিন স্বপ্ন, এবং তারপর যৌবনের কঠিন বাস্তবতা সব মিলিয়েই আমাদের এই পথচলা। আর এই চলার পথে আমরা কখন যে নিজেদের অজান্তেই এক যান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে যাই, তা হয়তো আমরা নিজেরাও টের পাই না।
আমরা প্রতিনিয়ত ছুটছি। কখনো ভালো ফলাফলের আশায়, কখনো কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যে, কখনো প্রিয় কোনো স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার জন্য, আবার কখনো সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষায়। আধুনিক এই প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াইটা বড়ই কঠিন। এখানে সবাই প্রথম হতে চায়, সবাই চায় সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত তার উপার্জনের অঙ্ক কিংবা পদমর্যাদার হিসাব নিয়ে ভাবেন না। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে কেউ বলে না, “আমি যদি অফিসে আরও একটু বেশি সময় দিতাম!” বরং তখন মনের আয়নায় ভেসে ওঠে কিছু মুখ, কিছু স্মৃতি, কিছু গল্প। মনে পড়ে যায় প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো হাসি-কান্নার দিনগুলো। আক্ষেপ হয় এই ভেবে যে, “যদি আমার পরিবারকে আরও একটু সময় দিতাম, যদি বন্ধুদের সাথে আরেকটু বেশি হাসতাম!”
যান্ত্রিক এই শহরে প্রতিযোগিতার কোনো শেষ নেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু একটা চিন্তাই আমাদের মাথায় ঘোরে কীভাবে আরও সফল হওয়া যায়, কীভাবে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকা যায়। এই নিরন্তর ছুটোছুটিতে সাফল্যের ঝুলিতে একসময় হয়তো অনেক অর্জন জমা হয়। পরিচিতি বাড়ে, মানুষের মাঝে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, ব্যাংক ব্যালেন্স সমৃদ্ধ হয়, পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা হয়, সম্মাননা ও পুরস্কারে ভরে ওঠে বুকশেলফ। সমাজের চোখে আমরা হয়ে উঠি ‘সফল’ একজন মানুষ।
জীবন বড়ই অনিশ্চিত। তাই প্রতিটি দিনকে শুধু সংগ্রামের দিন হিসেবে নয়, উদযাপনের দিন হিসেবেও দেখার চেষ্টা করি। জীবনে কী নেই, সেই হিসাব করার পরিবর্তে জীবনে কী কী আছে, তা ভেবে কৃতজ্ঞ হই
কিন্তু দিনশেষে, যখন কোলাহল থেমে যায়, যখন মানুষ নিজের সঙ্গে একান্তে সময় কাটায়, তখন কি এসব অর্জনই তাকে প্রকৃত সুখ দেয়? ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন কেউ বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, তখন কি তার মনে হয় যে সে পরিপূর্ণ? একটু গভীরভাবে ভাবলে এই প্রশ্নের উত্তরটি সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। জীবনের অনেক অর্জনের জৌলুস সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়। আজ যে পুরস্কার বা পদবী পেয়ে কেউ আনন্দে আত্মহারা হচ্ছে, কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর তা কেবলই একটি সাধারণ স্মৃতি বা শোকেসের এক কোণে পড়ে থাকা ধুলোপড়া বস্তুতে পরিণত হবে।
কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু জিনিস থাকে, যার আবেদন কখনো কমে না। কিছু স্মৃতি কখনো ম্লান হয় না। সেগুলো হলো আপনজনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। একটু ভেবে দেখুন তো, জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে চোখের সামনে কী ভেসে ওঠে? হয়তো কোনো বড় ডিগ্রির সার্টিফিকেট নয়, বরং বাবা-মায়ের স্নেহভরা মুখ, তাদের তৃপ্তির হাসি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দের সময়, এক টেবিলে বসে সবার সাথে হাসতে হাসতে খাওয়া রাতের খাবার, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো নির্ভার বিকেল কিংবা বৃষ্টিভেজা দিনে চায়ের দোকানে আড্ডা, জীবনসঙ্গীর সঙ্গে এক কাপ চায়ের উষ্ণতা ভাগ করে নেওয়া কিংবা অফিস থেকে ফেরার পর সন্তানের খিলখিল হাসিতে ভরে ওঠা কোনো সন্ধ্যা। এসব মুহূর্তই জীবনের প্রকৃত সম্পদ, যা পৃথিবীর কোনো অর্থমূল্যে পরিমাপ করা যায় না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সাফল্যের পেছনে এই অন্ধের মতো ছুটতে গিয়ে আমরা অনেক সময় আমাদের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোকেই অবহেলা করি। আমরা এক অদ্ভুত মোহে আটকে পড়ি। আমরা ভাবি, “আগে প্রতিষ্ঠিত হই, তারপর সবাইকে সময় দেব। আগে একটা গাড়ি কিনি, তারপর পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে যাব।” কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত নীরবে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায়। আমরা যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আমাদের বাবা-মায়ের বয়স বেড়ে যাচ্ছে, তাদের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। আমাদের সন্তানরা আমাদের সান্নিধ্য ছাড়াই বড় হয়ে যাচ্ছে। ব্যস্ততার অজুহাতে আজ যে সময়টুকু আমরা প্রিয়জনদের দিতে পারিনি, হয়তো আগামীকাল সেই সুযোগ আর ফিরে আসবে না। সময়ের এই নির্মম পরিহাসের কারণে অনেকেই জীবনের শেষ বেলায় এসে গভীর অনুশোচনায় ভোগেন।
মানুষের জীবনে অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা বাহ্যিক সাফল্যের গুরুত্ব অবশ্যই আছে। জীবন ধারণের জন্য, একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু কোনো বড় ডিগ্রি, বিলাসবহুল বাড়ি বা দামী গাড়ি কখনো মানুষের ভেতরের একাকীত্ব দূর করতে পারে না। একটা বিশাল অট্টালিকাও নিস্তব্ধতায় খাঁ খাঁ করতে পারে, যদি সেখানে আপন মানুষের পদচারণা আর হাসি-আনন্দ না থাকে। হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ করতে পারে কেবল প্রিয় মানুষের ভালোবাসা, একটি আন্তরিক খোঁজখবর, একটি উষ্ণ আলিঙ্গন কিংবা কিছু সময়ের সান্নিধ্য। যখন আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি, তখন আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স এসে আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না, দেয় আমাদের কাছের মানুষগুলো।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত তার উপার্জনের অঙ্ক কিংবা পদমর্যাদার হিসাব নিয়ে ভাবেন না। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে কেউ বলে না, “আমি যদি অফিসে আরও একটু বেশি সময় দিতাম!” বরং তখন মনের আয়নায় ভেসে ওঠে কিছু মুখ, কিছু স্মৃতি, কিছু গল্প। মনে পড়ে যায় প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো হাসি-কান্নার দিনগুলো। আক্ষেপ হয় এই ভেবে যে, “যদি আমার পরিবারকে আরও একটু সময় দিতাম, যদি বন্ধুদের সাথে আরেকটু বেশি হাসতাম!” সেই মুহূর্তগুলোই তখন হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান এবং একমাত্র সম্বল।
তাই আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই। আমরা সাফল্যের পথে এগিয়ে যাব, স্বপ্ন পূরণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করব; কিন্তু সেই পথচলায় সম্পর্কের বন্ধন যেন কোনোভাবেই শিথিল না হয়ে যায়। অর্জনের পাশাপাশি আপনজনদের জন্যও সময় বরাদ্দ রাখি। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত তুলে রাখি তাদের জন্য, যারা নিঃস্বার্থভাবে আমাদের ভালোবাসে, আমাদের সুখে-দুঃখে ছায়ার মতো পাশে থাকে। দিনে অন্তত কিছুটা সময় মোবাইল ফোন ও কাজের চিন্তা সরিয়ে রেখে পরিবারের সাথে মন খুলে কথা বলা, ছুটির দিনে তাদের নিয়ে কোথাও ঘুরে আসা আমাদের সম্পর্কগুলোকে আরও নিবিড় করবে।
জীবন বড়ই অনিশ্চিত। তাই প্রতিটি দিনকে শুধু সংগ্রামের দিন হিসেবে নয়, উদযাপনের দিন হিসেবেও দেখার চেষ্টা করি। জীবনে কী নেই, সেই হিসাব করার পরিবর্তে জীবনে কী কী আছে, তা ভেবে কৃতজ্ঞ হই। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, বাবা-মায়ের আশীর্বাদকে অমূল্য জ্ঞান করি, আপনজনদের ভালোবাসাকে সম্মান করি এবং শত ব্যস্ততার মাঝেও তাদের জন্য কিছুটা সময় বের করি।
কারণ দিনশেষে, জীবনের খাতা মেলালে অর্জনের হিসাব হয়তো অনেক হবে, দেয়ালজুড়ে হয়তো ঝুলবে অনেক সাফল্যের সনদ; কিন্তু আপনজনদের সঙ্গে কাটানো সময়ই হবে জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি। এই স্মৃতিগুলোই আমাদের আত্মাকে প্রশান্তি দেবে, আমাদের জীবনকে করবে সত্যিকারের অর্থবহ ও পরিপূর্ণ।
- জয় পাল অর্ঘ একজন তরুণ কলামিস্ট; তিনি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, গোবিপ্রবির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
ইমেইল : [email protected]













