বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন, ‘যে শিক্ষায় নতুন জ্ঞানের জন্ম হয় না, তা কেবলই পুরোনো তথ্যের পুনরাবৃত্তি।’ বস্তুত, ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির মাঝেই যেন এক অসীম রোমাঞ্চ, এক অবারিত মুক্তির স্বাদ লুকিয়ে আছে। কৈশোরের গণ্ডি পেরিয়ে যখন একজন তরুণ বা তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে পা রাখে, তার চোখে থাকে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। সে ভাবে, এখানে সে কেবল বইয়ের পাতায় আবদ্ধ থাকবে না; সে প্রশ্ন করবে, খুঁজবে, জানবে এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই রঙিন স্বপ্নগুলো খুব দ্রুতই ধূসর বাস্তবতার দেয়ালে আছড়ে পড়ে।
আমাদের উচ্চশিক্ষার আঙিনায় আজ সবচেয়ে বড় যে হাহাকার, তা হলো গবেষণাহীনতা। গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষা যেন প্রাণহীন এক সুসজ্জিত কঙ্কাল, যার বাইরের চাকচিক্য আছে, কিন্তু ভেতরে নেই কোনো স্পন্দন। একটু গভীরভাবে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন একেকটি বিশাল কারখানা। এই কারখানায় প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ প্রবেশ করছে, আর বছর শেষে হাতে একটি রঙিন সনদ নিয়ে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু এই চার বা পাঁচ বছরে তাদের মননশীলতার কতটা বিকাশ ঘটছে?
গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে। তারা তত্ত্ব মুখস্থ করছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তব জীবনে বা শিল্পক্ষেত্রে সেই তত্ত্বের প্রয়োগ শিখছে না।
বাস্তবতা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা মূলত পরীক্ষা ও ফলাফলকেন্দ্রিক। শিক্ষকের পুরোনো দিনের হলদেটে হয়ে যাওয়া নোটবই, ক্লাসে লেকচার তোলা, আর পরীক্ষার আগের রাতে তা অন্ধের মতো মুখস্থ করে খাতায় উগরে দেওয়া—এটাই যেন সফলতার একমাত্র মাপকাঠি। যে তরুণের চোখে একদিন নতুন আবিষ্কারের নেশা ছিল, বাস্তবতার জাঁতাকলে পড়ে সেও একসময় কেবল একটি ‘নিরাপদ চাকরি’ বা ‘বিসিএস’-এর অন্ধ মোহে নিজের সৃজনশীলতাকে বিসর্জন দেয়। গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি করার বদলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন শিক্ষার্থীদের শেখায়, কীভাবে প্রশ্ন না করে সবকিছু মুখ বুজে মেনে নিতে হয়।
উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। আর এই নতুন জ্ঞান সৃষ্টির একমাত্র বাহন হলো গবেষণা। কিন্তু আমাদের দেশে গবেষণার চিত্রটি বড্ড করুণ ও হতাশাজনক। এর পেছনে বেশ কয়েকটি নিরেট বাস্তব কারণ রয়েছে।
প্রথমত, জাতীয় বাজেটে গবেষণার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, তা রীতিমতো উপহাসের শামিল। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গবেষণার জন্য যে যৎসামান্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়ে একটি মানসম্মত ফিল্ডওয়ার্ক বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাও সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে যারা পড়তে আসে, তারা দেখে ল্যাবরেটরিগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতির তীব্র অভাব। যেটুকু আছে, তা-ও অনেক সময় রক্ষণাবেক্ষণ বা প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গ্রন্থাগারগুলো আজ পরিণত হয়েছে কেবল চাকরির গাইড বই পড়ার নীরব পাঠকক্ষে।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল কাজ হওয়া উচিত অ্যাকাডেমিক গবেষণা ও নিবিড় পাঠদান। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, পদোন্নতি বা প্রশাসনিক ক্ষমতার মোহে অনেকেই রাজনীতি কিংবা অন্য কোনো পেশায় বেশি সময় ব্যয় করছেন। গবেষণার চেয়ে দলীয় আনুগত্য যখন সফলতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন গবেষণার মতো নীরব ও কষ্টসাধ্য কাজে কেউ আর আগ্রহ পান না।
রাষ্ট্রকে এটা অনুধাবন করতে হবে যে, গবেষণায় অর্থ ব্যয় কোনো অপচয় নয়; বরং এটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় রাজনীতির আখড়া না বানিয়ে বরং গড়ে তুলতে হবে গবেষণার মুক্তাঙ্গন হিসেবে।
এই গবেষণাহীন, শুষ্ক ও নিরস পরিবেশের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হলো ‘ব্রেইন ড্রেইন’ (Brain Drain) বা মেধাপাচার। যে মেধাবী তরুণটি দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিল, যে চেয়েছিল নিজের ল্যাবে বসে নতুন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করে দেশের মানুষের কষ্ট লাঘব করতে, সে যখন দেখে তার দেশে তার মেধা বা স্বপ্নের কোনো মূল্যায়ন নেই, তখন বুকভরা অভিমান নিয়ে পাড়ি জমায় ভিনদেশে। ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার উন্নত ল্যাবরেটরিগুলোতে আমাদের দেশের এই মেধাবীরাই আজ অভাবনীয় সব কাজ করছে। কিন্তু তাদের সেই মেধা ও গবেষণার সরাসরি সুফল আমাদের দেশ পাচ্ছে না। আমরা কেবল তাদের সাফল্য দেখে দূর থেকে হাততালি দিচ্ছি, আর আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি।
এই মেধাপাচার কেবল কিছু মানুষের দেশত্যাগ নয়; এটি আমাদের জাতির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের এক নীরব রক্তক্ষরণ। গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে। তারা তত্ত্ব মুখস্থ করছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তব জীবনে বা শিল্পক্ষেত্রে সেই তত্ত্বের প্রয়োগ শিখছে না। ফলে ইন্ডাস্ট্রি বা করপোরেট জগৎ যে ধরনের দক্ষ, বিশ্লেষণধর্মী ও সমস্যা সমাধানে পারদর্শী (Problem-solving) জনবল খুঁজছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা তৈরি করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
এর ফলেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—একদিকে দেশে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার হতাশার গ্লানি নিয়ে ঘুরছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে উচ্চ বেতনে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিচ্ছে।
এই ঘোর অমানিশার কি কোনো শেষ নেই? আমাদের উচ্চশিক্ষা কি কেবলই কেরানি আর বেকার তৈরির কারখানাই থেকে যাবে? না, এমনটা চলতে দেওয়া যায় না। আমাদের তরুণদের মেধার কোনো ঘাটতি নেই। ঘাটতি কেবল সদিচ্ছা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং সঠিক পরিবেশের।
এই রূঢ় বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের মানসিকতা ও কাঠামোর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে এটা অনুধাবন করতে হবে যে, গবেষণায় অর্থ ব্যয় কোনো অপচয় নয়; বরং এটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় রাজনীতির আখড়া না বানিয়ে বরং গড়ে তুলতে হবে গবেষণার মুক্তাঙ্গন হিসেবে। শিক্ষকদের পদোন্নতি ও মূল্যায়নের প্রধান শর্ত হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা।
একই সঙ্গে শিল্পকারখানার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ গবেষণার (Industry-Academia Linkage) উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে এসে দেশের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতে শেখে।
পরিশেষে, একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় হোক এক অনন্ত জিজ্ঞাসার তীর্থস্থান, কেবল একটি সনদের অপেক্ষাগার নয়। আসুন, আমরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন দেখি ও কাজ করি, যেখানে তরুণ প্রজন্ম আর মুখস্থবিদ্যার দাসত্ব করবে না। তারা ল্যাবরেটরিতে, মাঠে-ঘাটে ও গ্রন্থাগারে গবেষণার আলো জ্বেলে আলোকিত করে তুলবে এই প্রিয় মাতৃভূমিকে। গবেষণার সেই নতুন ভোরেই কেবল আমাদের উচ্চশিক্ষা ফিরে পাবে তার হারানো প্রাণ, আর আমাদের বাংলাদেশ পাবে এক সোনালি ভবিষ্যতের দিশা।
- মো. বাইজিদ শেখ একজন তরুণ কলামিস্ট; বর্তমানে তিনি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে অধ্যয়নরত













