ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে যখন একটি শিশুর পা পড়ার কথা ছিল, সেখানে আজ গড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। স্তব্ধ হয়ে গেছে সেই খিলখিল হাসি, থেমে গেছে ছোট্ট পায়ের চঞ্চল দৌড়; বাকি রয়ে গেছে কেবল এক বীভৎস নীরবতা। শকুনেরা এখন আর আকাশে ওড়ে না, তারা এখন পরিপাটি ভদ্রবেশে আমাদের আশেপাশেই ওত পেতে থাকে। বাংলাদেশের মানচিত্র আজ যেন নিষ্পাপ শিশুদের রক্তে ভেজা এক দীর্ঘশ্বাস।
দিন বদলাচ্ছে, সরকার পাল্টাচ্ছে, কিন্তু থামছে না মানুষরূপী হায়েনাদের এই নগ্ন নৃত্য। পিশাচের রাজত্বে আজ ঘর থেকে শুরু করে খেলার মাঠ—কোথাও কোনো অবোধ শিশুর জন্য এক ইঞ্চি নিরাপদ জমিও অবশিষ্ট নেই। আমরা আর কতকাল নির্বাক দর্শক হয়ে এই নিথর লাশের মিছিল গুনব? তিন-চার বছরের অবোধ শিশু, যার পৃথিবীর জটিলতা বোঝার বয়সই হয়নি, তাকেও আজ কামনার বলি হতে হচ্ছে। পিশাচের বিষদাঁতে পিষ্ট হচ্ছে আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। আমরা উন্নয়নের বড় বড় বুলি আউড়াই, জিডিপির হিসেব কষি, কিন্তু একটি শিশুকে নিরাপত্তা দেওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এটি কেবল কোনো অপরাধের খবর নয়; এটি এক একটি পচে যাওয়া বিবেকের ময়নাতদন্ত।
♦ ২০২৬ সালের শুরুতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়—জানুয়ারি মাসেই অন্তত ৩১ জন নারী ও কন্যা ধর্ষণের শিকার হন , আর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় অর্ধশত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে । বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো কেবল নথিভুক্ত ঘটনা; বাস্তবে সংখ্যা আরও অনেক বেশি
সকালবেলা যখন আপনি ড্রয়িংরুমে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন এবং আপনার ঘরের ছোট শিশুটি পাশে বসে খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে, ঠিক তখনই হয়তো দেশের কোনো এক প্রান্তে একটি রক্তাক্ত জামা কিংবা ধুলোবালিতে মাখা একটি ছেঁড়া ফিতা সমাজের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিচ্ছে। আমরা এমন এক বাংলাদেশে বাস করছি, যেখানে প্রবৃদ্ধির সূচক ওপরের দিকে উঠলেও মানবিকতার গ্রাফটি প্রতিদিন আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়ছে। একসময় ধর্ষণের খবর আসত নির্জন রাস্তা বা অন্ধকার কোনো গলি থেকে, কিন্তু আজ সেই অসুরেরা হানা দিচ্ছে শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়েও। ঘর, প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়েও আজ শিশুরা নিরাপদ নয়।
যে বয়সে হাতে খেলনা আর মুখে আধো আধো বুলি থাকার কথা, সেই বয়সেই তাদের রক্তে রঞ্জিত হতে হচ্ছে। এই পৈশাচিকতা প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি কোনো ভয় তো নেই-ই; বরং তাদের মনুষ্যত্ব বিলুপ্ত হয়ে সেখানে দানা বেঁধেছে আদিম জানোয়ারবৃত্তি। একটি অবোধ শিশু যখন ধর্ষিত হয়, তখন কেবল একটি শরীর লাঞ্ছিত হয় না; বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি জাতির বিবেক ধুলোয় মিশে যায়।
ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়া কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। আজ যদি অন্যের শিশুর ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা আওয়াজ না তুলি, তবে কাল হয়তো আপনার বা আমার নিজের সন্তান এই তালিকায় যুক্ত হবে
কেন বাংলাদেশে ধর্ষণের এই মহামারী নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির গভীরে। কঠোর আইন এবং মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং সাক্ষীর অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষকরা পার পেয়ে যাচ্ছে। যখন একটি ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত কার্যকর হয় না, তখন অন্য অপরাধীরা উৎসাহ পায়। আইনের ফাঁকফোকর আর রাজনীতির ঢাল যখন অপরাধীকে সুরক্ষা দেয়, তখন সমাজ থেকে ধর্ষণ নির্মূল করা কেবল একটি অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিচারহীনতার এই দেওয়ালই আজ ধর্ষকদের মনে এক অভয় অরণ্য তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার সাম্প্রতিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই অন্তত ৪৮১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন । একই বছরে মোট ধর্ষণের সংখ্যা কয়েক শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে, যার বড় একটি অংশই কন্যাশিশু । ২০২৬ সালের শুরুতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়—জানুয়ারি মাসেই অন্তত ৩১ জন নারী ও কন্যা ধর্ষণের শিকার হন , আর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় অর্ধশত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে । বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো কেবল নথিভুক্ত ঘটনা; বাস্তবে সংখ্যা আরও অনেক বেশি, কারণ অসংখ্য ঘটনা সামাজিক লজ্জা ও বিচারহীনতার কারণে প্রকাশ পায় না
কেবল আইন দিয়ে হয়তো অপরাধ কমানো যায়, কিন্তু নির্মূল করতে প্রয়োজন সামাজিক শুদ্ধি অভিযান। বর্তমানে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির অবাধ লভ্যতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং নারীকে কেবল ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে দেখার হীন মানসিকতা এই ব্যাধিকে ত্বরান্বিত করছে। পারিবারিক শিক্ষার অভাব আজ আমাদের সন্তানদের নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শেখাতে পারছি কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়? নাকি কেবল জিপিএ-৫-এর পেছনে দৌড়াতে গিয়ে আমরা তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেই ভুলে গেছি? এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন না এলে কেবল ফাঁসির দড়ি দিয়ে এই পিশাচদের থামানো সম্ভব হবে না।
ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়া কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। আজ যদি অন্যের শিশুর ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা আওয়াজ না তুলি, তবে কাল হয়তো আপনার বা আমার নিজের সন্তান এই তালিকায় যুক্ত হবে। মৌনতা মানেই এখানে অপরাধীকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দেওয়া। স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। শকুনের থাবা থেকে শিশুদের বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই বজ্রকণ্ঠে প্রতিবাদী হতে হবে।
বুকের দুধের ঘ্রাণ না মুছতেই যখন একটি শিশুকে সাদা কাফনে জড়িয়ে কবরে শুতে হয়, তখন সেই দায়ভার আমাদের সবার। সভ্যতার এই চরম পরাজয় আমরা আর কতকাল চেয়ে চেয়ে দেখব? পিশাচের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়ার সময় এখনই। অন্যথায়, আগামীর ইতিহাস এই নির্বাক সমাজকে কখনো ক্ষমা করবে না। আমরা কি তবে মানুষ হতে পারলাম না? এই জ্বলন্ত প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাজের মাধ্যমেই দিতে হবে। অন্ধকার এই গহ্বর থেকে সমাজকে টেনে তোলার দায়িত্ব এখন আমার, আপনার, আমাদের সবার। আজ যদি আমরা একজোট হয়ে পিশাচদের এই বিষদাঁত ভেঙে না দিই, তবে কোনো শিশুর হাসিতেই আর কখনো নিরাপদ ভোরের সূর্য উঠবে না।
লেখক : শিমলা পাল একজন তরুণ কলামিস্ট; বর্তমানে তিনি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়ন করছেন।
ইমেইল : [email protected]
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













