নতুন বছর ২০২৬ শুরু হয়েছে। ঘটনাবহুল বিদায়ি বছরে অর্থনীতির নানা বিষয় ছিল আলোচনায়। নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। বিভিন্ন কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য আর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এত বেশি রাজনৈতিক ঘটনার ঘনঘটা বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির গন্তব্য কোন দিকে, সে প্রশ্নটিও আড্ডায়, রকে-রেস্তোরাঁয়, পরিবারে, স্বজন সমাবেশে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা হয়েছে বৃহৎ পরিসরেও। একটি সফল নির্বাচন এই প্রশ্নটির কতটা মীমাংসা করতে পারে, তা এখনই বলে দেওয়া যায় না।
তবে এ কথা ঠিক, দেশ এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচনটি কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, তার ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ। ২০২৫ সালের আলোচিত ঘটনা নিয়ে এই আয়োজন যেখানে থাকবে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি।
১. কৃষি অর্থনীতি : আলু উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে দাম পড়ে যায়। একপর্যায়ে হিমাগারের গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। এতে উত্পাদন খরচ তুলতে পারেননি কৃষকেরা। অস্থির ছিল পেঁয়াজের বাজারও। হঠাত্ করে দেশের বাজারে গেল বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা কেজিপ্রতি দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এখন খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। ধান, মাছ, ডিম, সবজি—সব ক্ষেত্রেই উত্পাদনে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি কিন্তু গম, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, ফল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা আজও আমদানিনির্ভর। ডিম উত্পাদনে স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছলেও তরল দুধ উত্পাদনে দেশ পিছিয়ে রয়েছে। অথচ মাঠে শস্যভরা থাকলেও কোটি মানুষের হাঁড়ি আধা-ভরা। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবু কেন ক্ষুধার্ত মুখ?
২. দারিদ্র্য প্রকট : বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার বছর ধরে দারিদ্র্য বেড়েছে। ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশের কিছু বেশি হয়েছে। দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ।। দারিদ্র্য-বহির্ভূত মানব-বঞ্চনা আরো তীব্রতর হচ্ছে। প্রায় ১১ কোটি মানুষের নিরাপদ সুপেয় জলের সুবিধা নেই। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ৫৭ শতাংশ শিশু দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। গত ছয় বছরে শিশুশ্রম বেড়ে গেছে—২০১৯ সালের ৬ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালের ৯ শতাংশ পর্যন্ত।
৩. বৈষম্য : বাংলাদেশের উচ্চতম ১০ শতাংশ মানুষ দেশের ৫৮ শতাংশ সম্পদের মালিক, আর দেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ (দেশের অর্ধেক লোক) ৪ শতাংশ সম্পদ ভোগ করে। সাম্প্রতিক সময়ে যদিও গ্রামীণ বাংলায় আয় অসমতা স্থিতিশীল রয়েছে, দেশের শহরাঞ্চলে তা বেড়ে গেছে। বৈষম্যের বৈশ্বিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি। বাংলাদেশের ১ শতাংশ মানুষের কাছে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ২৪ শতাংশ। আর মোট জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ রয়েছে তাদের হাতে।
৪. আর্থিক খাত : পাঁচ ব্যাংক একীভূত একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গত সরকারের মেয়াদে লুটপাট হওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। রেকর্ড খেলাপি ঋণ। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। গত সরকারের মতো এবারও খেলাপি হওয়া ব্যবসায়ীদের ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এছাড়া ঋণ পুনঃ তপশিল, অবলোপনের নীতিমালা সহজ করে দেওয়া হয়েছে। বছর জুড়েই শেয়ার বাজারে ছিল মন্দাভাব। সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও কমে গেছে। বিপর্যস্ত ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
৫. ঋণের ফাঁদ পাতা ভুবনে : বিগত কয়েক বছরে ব্যাংকের ওপর ঋণনির্ভরতা বেড়েছে; যেমন—২০২২ সালের শেষ থেকে ২০২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই আমানতের ৮৭ শতাংশ সরকার ঋণ হিসেবে নিয়েছে এবং বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। এখন প্রশ্ন হলো, সরকার কেন এত বেশি ঋণ নেয় এবং কেনই সুদে-আসলে তা পরিশোধ করতে হয়। একজন উপদেষ্টা বলেছেন, সরকার ঋণ নেয় বকেয়া ঋণ পরিশোধের জন্য। ইআরডির তথ্য বলছে, ২০২৪-২০২৫ বৈদেশিক ঋণের ৬৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে পূর্বের বকেয়া ঋণ পরিশোধের জন্য। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ঋণ কর্মসূচির আকার এখন ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের। পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। এরপর ডিসেম্বর ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ আর পাওয়া যায়নি।
৬. কর্মবিহীন প্রবৃদ্ধি : দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্তদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশ। কৃষি সংযুক্ত ভ্যালুচেইন বা ক্ষুদ্র আকারের উত্পাদন শিল্পের মতো শ্রমঘন খাতে বিনিয়োগ ছিল দুর্বল। অপর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা জালের সঙ্গে এটি যুক্ত হয়ে দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। চরম দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের।
৭. মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি : উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হারে বিধিনিষেধ শিথিল করে বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং সরকারি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে। ফলে দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে থাকার পর তা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। জুলাই ২০২৪-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জুনে এসে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
৮. রপ্তানি মন্থর : রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিস্থিতিতে এ খাতে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে টানা চার মাস রপ্তানি আয় কমছে। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর পাঁচ মাসে গড়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশের কম। রপ্তানি খাতের কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এতে ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় আরো কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আশার কথা শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে। এর প্রভাবে ভবিষ্যতে সার্বিকভাবে শিল্প খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
৯. এলডিসি উত্তরণে সংশয় : ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ হবে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে এই উত্তরণ অন্তত তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের এ উদ্বেগ জাতিসংঘকে জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে জাতিসংঘকে বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়নের অনুরোধ করা হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দিতে জাতিসংঘকে অনুরোধ জানানো হয়নি।
১০: এডিপি বাস্তবায়ন মন্থর : চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর—এই পাঁচ মাসে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৪৩ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের মাত্র ১১.৭৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৩৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাত্ গত বছরের তুলনায় পিছিয়ে আছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প যেন এগোচ্ছেই না। সরকারি তহবিল, বৈদেশিক সহায়তা ও সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন-প্রকল্প বাস্তবায়নে উন্নয়ন ব্যয়ের এ তিন উেসর প্রতিটিতেই যেন মন্থরতা লক্ষণীয়।
১১. বিনিয়োগ স্থবিরতা : এদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ৭ এপ্রিল থেকে চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট’ আয়োজন করে সরকার। চার দিনের সম্মেলনে খরচ হয় ৫ কোটি টাকা। এর পরও বিদেশি বিনিয়োগও থমকে আছে। পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ আসার গতি খুবই কম। বেসরকারি খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না বললেই চলে। তারা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
২০২৫ সালে একধরনের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের সমাজের জন্য একটি বিরাট সমস্যা হিসেবে অব্যাহত ছিল। এখন বাংলাদেশ একটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের এই নির্বাচন নিয়ে গণমানুষের প্রত্যাশা অনেক। আমরা আশা করি, এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রাণ সঞ্চারিত হবে।













