শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নহে, ইহা একটি জাতির আত্মা গঠনের প্রধান উপকরণ৷ যেই রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থায় ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা করিতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্র অচিরেই বৈষম্যকে উত্তরাধিকার হিসাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলিয়া দেয়। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী গ্রামাঞ্চলে বসবাস করিলেও শিক্ষার মান, সুযোগ ও ব্যয়ের দিক দিয়া তাহারা শহুরে শিক্ষার্থীদের তুলনায় বহুগুণ পিছাইয়া রহিয়াছে। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে আধুনিক অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রাচুর্য বিদ্যমান। অপরদিকে গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলির বড় একটি অংশ এখনো জরাজীর্গ ভবন, শিক্ষকসংকট ও প্রযুক্তিহীনতার মধ্যে কোনোমতে টিকিয়া আছে। এই বৈপরীত্য কেবল সুযোগের ফারাক সৃষ্টি করে না; ইহা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও সামাজিক গতিশীলতাকেও ক্ষতবিক্ষত করে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই অসম-কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে আরেকটি গভীর সংকট। তাহা হইল, ১৭ প্রকারের ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা। ইংরেজি মাধ্যম, ইংরেজি ভার্শন, কিন্ডারগার্টেন, কারিগরি, কওমি, আলিয়া, কমিউনিটি স্কুল–এই জগাখিচুড়ি ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব শিক্ষাকে একটি একীভূত জাতি গঠনের শক্তি হইতে বঞ্চিত করিয়াছে। শিক্ষাবিদদের মতে, পৃথিবীর খুব কম দেশেই এমন বিভক্ত ও অসংলগ্ন শিক্ষাকাঠামো বিদ্যমান। ফলে শিক্ষার মান ‘নিম্নগামী হইতেছে এবং শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মৌলিক গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতাও অর্জন করিতে ব্যর্থ হইতেছে। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে থাকা বা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মৌলিক দক্ষতার স্তরে পৌছাইতে পারিতেছে না। এই ব্যর্থতার আর্থিক ক্ষতি ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশের সমান হইতে পারে, যা কেবল সংখ্যাতান্ত্রিক ক্ষতি নহে, বরং একটি জাতির সম্ভাবনার বিপুল অপচয়। শিক্ষা হইতে ঝরিয়া পড়া শিশুদের মধ্যে অল্প বয়সে গর্ভধারণ, অপরাধপ্রবণতা ও সহিংসতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়; বিশেষত মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরো গভীর।
এই বৈষম্যের শিকড় অনুসন্ধান করিলে দেখা যায়, ইহার উৎস গপনিবেশিক আমলে৷ ব্রিটিশ শাসনামলে শহরকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়িয়া উঠিয়াছিল, যাহার সুবিধাভোগী ছিল নগরভিত্তিক অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। স্বাধীনতার পর শিক্ষা বিস্তারে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও এঁতিহাসিক এই বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা যায় নাই। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও দুর্বল তদারকির কারণে ইহার বিস্তার আরো সুদৃঢ় হইয়াছে। শহরের অভিভাবকেরা সন্তানের শিক্ষায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ করিতে সক্ষম; প্রাইভেট টিউশন, কোচিং, অনলাইন কোর্স ও আন্তর্জাতিক কারিকুলাম তাহাদের নিকট স্বাভাবিক বাস্তবতা। অপরদিকে গ্রামীণ শিক্ষার্থী এখনো বিদ্যুদ্বিহীন শ্রেণিকক্ষে বসিয়া ভাঙা বেঞ্চে বই খুলিয়া রাখে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই বৈষম্য নির্মমভাবে উন্মোচিত হইয়াছে–শহরের শিশুরা অনলাইনে শিক্ষা চালু রাখিলেও গ্রামের বহু শিশু স্থায়ীভাবে শিক্ষার বাহিরে ছিটকাইয়া পড়ে।
সরকারি প্রকল্প ও নীতিমালার অভাব নাই; অভাব রহিয়াছে কার্যকর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতার। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, উপবৃত্তি, বিনা মূল্যে বই বিতরণ; এই উদ্যোগসমূহ ইতিবাচক, কিন্তু প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে ইহার সুফল অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক বিদ্যালয়ে পৌছায় নাই। ফলাফল–সনদধারী অথচ দক্ষতাহীন এক প্রজন্ম, যাহারা শিক্ষিত হইয়াও কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় টিকিতে পারে না। জাতীয় শিক্ষানীতিতে গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমানোর কথা বলা হইলেও বাস্তবে আলাদা কোনো কাঠামো গড়ে উঠে নাই। শিক্ষা মানুষের আত্মমুক্তির পথ৷ গ্রাম ও শহরের শিক্ষাবৈষম্য দূর করা মানে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নহে; ইহা একটি নৈতিক অঙ্গীকার ৷ যেই দিন গ্রামের শিশুও শহরের শিশুর মতো একই মানের শিক্ষা, একই প্রযুক্তি ও একই মর্যাদা লাভ করিবে, সেই দিনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত জাতি হইয়া উঠিবে। সেই দিন আসিবে কি না, তাহা নির্ভর করে আজকের রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা ও সামাজিক দায়বোধের উপর।













