একটি সমাজ কখনো আকস্মিকভাবে হিংস্র হয় না—ইহা ধীরে ধীরে, অদৃশ্যভাবে, অন্তর্গত নৈতিক ক্ষয়ে ভেতর হইতে ভাঙিয়া পড়ে। সাম্প্রতিক কালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সংবাদ একের পর এক প্রকাশিত হইতেছে, তাহা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নহে—ইহা আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।
রাজধানীর ব্যস্ততম অঞ্চল হইতে এক ব্যক্তির খণ্ডিত হাত-পা উদ্ধার হইয়াছে। পল্টন, বায়তুল মোকাররম, কমলাপুর—মানুষের ভিড়ে পূর্ণ এই স্থানগুলিতে দেহের খণ্ডাংশের ছড়াইয়া থাকা দৃশ্য যেন আমাদের নাগরিক নিরাপত্তাবোধকে নির্মমভাবে বিদ্ধ করিয়াছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদি ও নাতনির রক্তাক্ত পরিণতি—এ যেন আরও এক নির্মম অধ্যায়। একটি নির্জন গৃহ, মধ্যরাত্রির আর্তচিৎকার, এবং পরদিন উঠানে ও সরিষাক্ষেতে দুই প্রজন্মের নিথর দেহ। প্রাথমিক ধারণা বলিতেছে—প্রতিরোধ করিবার অপরাধে এক বৃদ্ধা নিহত, এবং এক কিশোরী সম্ভাব্য ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা। মানবসমাজের কোন স্তরে আমরা দাঁড়াইয়াছি, যেখানে সম্ভ্রমরক্ষা করিতে গিয়া জীবন বিসর্জনই শেষ পরিণতি? নরসিংদীর মাধবদীতে এক কিশোরী পরিবার পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার চাহিয়াছিল। ফলত, পুনরায় অপহরণ, পুনরায় নির্যাতন, এবং অবশেষে হত্যা করা হয় ঐ কিশোরীকে। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে তৃতীয় শ্রেণির এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা তো হৃদয় বিদারক । ছেঁড়া মালার পুঁতি ও পরিত্যক্ত ঘরের অন্ধকার—এই সামান্য সূত্র ধরিয়া রহস্য উদ্ঘাটিত হইয়াছে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, অভিযুক্তরা কিশোর। অর্থাৎ হিংস্রতার বীজ আমাদের কিশোরদের মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত হইতেছে।
এই সকল ঘটনার মধ্যে একটি অভিন্ন সুর লক্ষণীয়—হিংসা যেন ক্রমে স্বাভাবিকীকৃত হইতেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্তাক্ত দৃশ্যের অবাধ প্রচার, দৈনন্দিন কথোপকথনে সহিংসতার অবচেতন গ্রহণযোগ্যতা, এবং দ্রুত প্রতিশোধস্পৃহা—ইহা মিলিয়া এক বিপজ্জনক মানসিক পরিবেশ নির্মাণ করিতেছে। মানুষ ক্রোধ দমন করিবার শিক্ষা হারাইতেছে, যুক্ত ও সংযমের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পাইতেছে।
আরও এক গভীর দিক আছে—যখন সাধারণ মানুষ অনুভব করে যে ন্যায়বিচার অনিশ্চিত, বিলম্বিত, অথবা প্রভাবান্বিত, তখন দুই প্রকার প্রতিক্রিয়া জন্মে। একদল হতাশ ও নিশ্চুপ হইয়া পড়ে, অন্যদল আইন নিজের হাতে লইবার প্রবণতায় উৎসাহিত হয়। উভয়ই একটি সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য অশনিসঙ্কেত। তবে কেবল রাষ্ট্রকে দায়ী করা সম্পূর্ণ ঠিক নহে। পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান—সকলের ভূমিকাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান যদি ছোটবেলা হইতে সহমর্মিতা, সংযম ও নারীর মর্যাদা সম্পর্কে যথার্থ শিক্ষা না পায়, তবে আইন কেবল পরবর্তী প্রতিকারের মাধ্যম হইতে পারে, প্রতিরোধের নহে। আমাদের সংস্কৃতিতে যে মানবিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য ছিল—পাড়া-প্রতিবেশীর দায়বদ্ধতা, দুর্বলকে রক্ষা করিবার মানসিকতা, সামাজিক লজ্জাবোধ—সেই অদৃশ্য সুরক্ষা-বলয় আজ শিথিল।
প্রশ্ন হইল, আমরা কি আমাদের চারপাশে বেড়ে ওঠা ঘৃণা, কুরুচি ও অবমাননাকে যথাসময়ে প্রতিহত করিতেছি? আমরা সর্বসাধারণ কি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াইবার নৈতিক সাহস রাখি? আমরা কি সন্তানদের শেখাই—মানুষের শরীর সম্মানেরও বিষয়? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত তদন্ত ও গ্রেপ্তারের কথা বলিয়াছেন। ইহা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য হইবে তখনই, যখন অপরাধের ভয় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হইবে, এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রত্যেকে অনুভব করিবে। সুতরাং রক্তাক্ত সরিষাক্ষেত, বস্তাবন্দি শিশুদেহ, নগরীর পথে খণ্ডিত অঙ্গ—এই চিত্রগুলি কেবল সংবাদপত্রের কলামে সীমাবদ্ধ থাকিলে চলিবে না। ইহারা আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়িতেছে। সভ্যতার পরিমাপ প্রযুক্তি বা অট্টালিকার উচ্চতায় নহে—ইহা নির্ধারিত হয় দুর্বলতম মানুষের নিরাপত্তা দ্বারা।
যদি আমরা এখনো সতর্ক না হই, তবে হিংস্রতার এই স্রোত আমাদের সমাজের মূল ভিত্তিকেই ক্ষয় করিবে। এখন নূতন করিয়া প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার পুনর্নির্মাণের। নচেৎ একদিন আমরা দেখিব, হত্যার সংবাদ আর আমাদের হৃদয়কে কম্পন সৃষ্টি করে না—কারণ, আমরা অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি। সেই দিনটিই হইবে প্রকৃত বিপর্যয়ের সূচনা।













