সকাল ৭টায় ফার্মগেটের যানজট কিংবা মিরপুর রোডে গাড়ির দীর্ঘ সারি—ঢাকার এই চিরচেনা রূপের পেছনে বড় একটি কারণ ‘স্কুল ট্রাফিক’। রাজধানীতে স্কুল সময়ে যানজট নিরসনে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সরকারও সম্প্রতি আলোচনা করেছে। এই বাস্তবতায় জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন, তিন দিন অফলাইন’ ক্লাস পরিচালনার সিদ্ধান্তটি প্রথম দেখায় বেশ স্মার্ট মনে হতে পারে; কিন্তু টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—পুরো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই ফলপ্রসূ, নাকি ‘মাথাব্যথায় মাথা কেটে ফেলার’ মতো কোনো ব্যবস্থা?
শহরের স্বস্তি বনাম প্রান্তিকের ভোগান্তি
রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোর কথা যদি ধরি, এই পলিসি কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। রাস্তায় প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাসের চাপ কমবে, ফলে পেট্রোল-অকটেনের মতো মূল্যবান জ্বালানি সাশ্রয় হবে। নামিদামি স্কুলগুলোর জেনারেটর বা এসির ব্যবহার কমায় বিদ্যুৎও কিছুটা সাশ্রয় হতে পারে।
কিন্তু ঢাকার বাইরের চিত্রটা কী?
ধরা যাক, কুড়িগ্রামের কোনো এক গ্রামের কথা। সেখানকার কোনো শিক্ষার্থী তো আর প্রাইভেটকারে বা এসি বাসে স্কুলে যায় না; সে যায় পায়ে হেঁটে, সাইকেলে বা ভ্যানে। সেখানে যানজটের প্রশ্নই আসে না। অথচ শহরের যানজট আর জ্বালানি বাঁচাতে গিয়ে গ্রামের সেই ছেলেটির অফলাইন শিক্ষার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এখানেই নীতিনির্ধারণের বড় ভুলটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ঢাকার সমস্যা দিয়ে পুরো বাংলাদেশকে দেখা।
লোডশেডিং ও বাফারিংয়ের লুকোচুরি
জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় এবং সরাসরি প্রভাব হলো লোডশেডিং। গ্রাম বা মফস্বলে দিনে ৫–৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকাটা এখন নিত্যদিনের রুটিন। বিদ্যুৎ ঘাটতির ভার গ্রামাঞ্চলই বেশি বহন করছে—এমন সমালোচনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
জুম বা গুগল মিটে শিক্ষক যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঙ্ক বোঝাচ্ছেন, ঠিক তখনই স্ক্রিন অন্ধকার—“কারেন্ট চলে গেছে”। এর পাশাপাশি রয়েছে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য। সবার বাসায় ওয়াই-ফাই বা আইপিএস (IPS) নেই। মোবাইল ডেটা কিনে দিনের পর দিন ক্লাস করা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য রীতিমতো ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।
পরিবারের একমাত্র স্মার্টফোনটি নিয়ে দুই-তিন ভাইবোন কীভাবে রুটিন ভাগ করে ক্লাস করবে, সেই উত্তর এই নীতিমালায় নেই। জ্বালানি বাঁচাতে গিয়ে আমরা আসলে এক বিশাল ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করছি।
আমাদের বাস্তবতায় বিকল্প কী হতে পারত?
গোটা দেশের জন্য ‘এক সাইজের জুতো’ না বানিয়ে আমাদের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় আরও কিছু টেকসই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত; যেমন—
- এলাকাভিত্তিক বিকেন্দ্রীকরণ
এই নিয়মটি কেবল ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো যানজটপ্রবণ বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত ছিল। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার স্কুলগুলো সপ্তাহে স্বাভাবিক নিয়মেই চলা উচিত, কারণ সেখানে যাতায়াতে বাড়তি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ে না।
- এসির বিলাসবহুল ব্যবহার বন্ধ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কক্ষগুলোতে এসির ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে কেবল সিলিং ফ্যান ও দিনের আলোর (daylight) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেত।
- স্কুল বাস ও লোকালয়ভিত্তিক ভর্তি
শহরের যত্রতত্র প্রাইভেটকারে স্কুলে আসা নিরুৎসাহিত করে প্রতিটি স্কুলের জন্য ‘কমিউনিটি স্কুল বাস’ বাধ্যতামূলক করা যেত। রাজধানীর স্কুল-আওয়ার ট্রাফিক নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্বেগও এ দিকটিকেই ইঙ্গিত করে।
শেষ কথা
জ্বালানি সংকট একটি রূঢ় বাস্তবতা। এটি মোকাবিলায় আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে পশ্চিমা ধাঁচের ‘অনলাইন ক্লাসের’ মডেল আমাদের দেশের সব স্তরে কার্যকর নয়। ঢাকার চশমা দিয়ে পুরো বাংলাদেশকে বিচার না করে, আমাদের উচিত এমন একটি বিকেন্দ্রীকৃত পলিসি গ্রহণ করা—যা শহরের জ্বালানিও বাঁচাবে, আবার গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার অধিকারও কেড়ে নেবে না।
লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : [email protected]
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













