বিশ্ব যখন এক অনিশ্চিত জ্বালানি বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব অনুভব করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং সরবরাহব্যবস্থার ব্যাহত প্রবাহ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ২০২২ সালে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ঊর্ধ্বগতি—সবকিছুই একটি জটিল সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভরতা। বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ হলেও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো দ্রুত নিঃশেষের দিকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত।
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কৃষি, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের জীবনে। বোরো মৌসুমে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ ধান উৎপাদন সেচনির্ভর, যেখানে ডিজেলের ব্যবহার অপরিহার্য। জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একইভাবে, শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং বাড়লে জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উভয়ই ব্যাহত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে? এর উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌরশক্তির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। প্রতিদিন সূর্যের আলো থেকে প্রতি বর্গমিটার জায়গায় গড়ে ৪ থেকে ৫ ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) শক্তি পাওয়া যায়, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। অথচ বর্তমানে মোট বিদ্যুতের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। এই হার বাড়িয়ে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সোলার হোম সিস্টেম এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে প্রণোদনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় কমানো, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শিল্পখাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। এটি কেবল সংকট মোকাবিলায় সহায়ক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক দক্ষতাও বৃদ্ধি করবে।
তৃতীয়ত, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ অপরিহার্য। একক উৎসের ওপর নির্ভরতা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা চালু হলে প্রায় ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা এবং জলবিদ্যুতের মতো বিকল্প উৎসগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিতে হবে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা দরকার। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ধরনের সহযোগিতা বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
পঞ্চমত, পরিবহন খাতে ধীরে ধীরে বিদ্যুতায়ন একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ যানবাহন জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বৈদ্যুতিক যানবাহন চালুর মাধ্যমে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবশেষে, জ্বালানি খাতে সুশাসন ও নীতিগত সংস্কার অপরিহার্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে, যাতে জ্বালানি অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হয়।
অতএব, বর্তমান জ্বালানি সংকটকে কেবল একটি সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে এই সংকটই বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই ও আত্মনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার পথ তৈরি করতে পারে। অন্যথায়, এই অস্থিরতা ভবিষ্যতে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল : [email protected]













