ঈদ মানে ঘরে ফেরা। রমজানের দীর্ঘ এক মাস শহরের ব্যস্ততায় কাটানোর পর মানুষ ছুটে যায় গ্রামের দিকে—মায়ের মুখ দেখতে, শিশুকে কোলে নিতে, আপনজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে। কিন্তু প্রতি বছর এই আনন্দযাত্রা পরিণত হয় মৃত্যুমিছিলে। ঈদের আগে ও পরে বাংলাদেশের সড়কগুলো হয়ে ওঠে রক্তাক্ত। কত পরিবার যে ঘরে ফেরে কফিনে—সেই হিসাব আমাদের বিবেককে তীব্রভাবে নাড়া দেয়।
সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু ঈদের সময় এ সমস্যা কয়েকগুণ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। লাখো মানুষ একসঙ্গে পথে নামেন, ওভারলোডেড বাস-ট্রাক ছুটে চলে, ক্লান্ত চালক ঘুমের সঙ্গে লড়াই করেন, আর পথের পাশে ওত পেতে থাকে মৃত্যু। এই চিত্র বদলাতে হবে এখনই; আর দেরি করা যাবে না।
সড়কে মৃত্যুর মিছিল
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বেসরকারি সংস্থা ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে-পরে মিলিয়ে গড়ে ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। আহত হন কয়েকশো। ২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে মাত্র সাত দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৮৯ জনেরও বেশি। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছিল শতকের ঘর।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে, একটি মায়ের কান্না আছে, একটি শিশুর এতিম হয়ে যাওয়ার গল্প আছে। যে মানুষটি ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন, তিনি আর ফিরলেন না। তাঁর পরিবারের ঈদ পরিণত হলো শোকে। এই ট্র্যাজেডি বারবার ঘটছে, আর আমরা প্রতিবারই শুধু চোখের জল ফেলছি; কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি না।
শুধু মৃত্যুই নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও প্রতি বছর আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। একজন উপার্জনক্ষম মানুষ যখন দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান, তখন পুরো পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি উঠে আসে না।
দুর্ঘটনার পেছনে কারণ কী?
ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একটি নয়, বরং একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো চালকের অতিরিক্ত কাজের চাপ ও ঘুম-বঞ্চনা। ঈদের মৌসুমে পরিবহন ব্যবসায়ীরা যত বেশি ট্রিপ দেওয়া যায়, তত বেশি আয়ের আশায় চালকদের বিরতি ছাড়া একটানা গাড়ি চালাতে বাধ্য করেন। একজন চালক যখন ২০–২৪ ঘণ্টা একটানা গাড়ি চালান, তখন তাঁর মস্তিষ্ক মাতাল মানুষের মতো কাজ করে—গবেষণা তাই বলছে। এই অবস্থায় রাস্তায় গাড়ি চালানো আর চোখ বেঁধে গাড়ি চালানো একই কথা।
দ্বিতীয় কারণ যানবাহনের অতিরিক্ত যাত্রী বহন বা ওভারলোডিং। ঈদের সময় বাস, লঞ্চ, ট্রাকে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ মানুষ তোলা হয়। ছাদে বসিয়ে মানুষ নেওয়া হয়, দরজায় ঝুলিয়ে নেওয়া হয়। এই অতিরিক্ত ভারে গাড়ির ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল হয়ে যায়, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তবুও প্রতি বছর একই দৃশ্য; কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করে।
তৃতীয় কারণ বেপরোয়া গতি। ঈদের রাস্তায় ‘কত দ্রুত যাওয়া যায়’—এই প্রতিযোগিতায় নামেন অনেক চালক। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো মানেই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া। গতি দ্বিগুণ হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি চারগুণ বাড়ে—এটি পদার্থবিজ্ঞানের সরল সত্য। কিন্তু এই সত্য মানার মতো সচেতনতা এখনো আমাদের সড়কে গড়ে ওঠেনি।
চতুর্থ কারণ অযোগ্য ও লাইসেন্সবিহীন চালক। বাংলাদেশে ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সের ছড়াছড়ি। প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই অনেকে বড় বাস চালাচ্ছেন। বিআরটিএর তথ্য বলছে, দেশে নিবন্ধিত চালকের সংখ্যার চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা বেশি; অর্থাৎ বহু গাড়িই চলছে অযোগ্য চালকের হাতে। এই অবস্থা চলতে থাকলে দুর্ঘটনা কমবে কীভাবে?
পঞ্চম কারণ সড়কের বেহাল অবস্থা। বাংলাদেশের অনেক মহাসড়কে এখনো গর্ত, ভাঙা ডিভাইডার এবং অস্পষ্ট লেনচিহ্ন রয়েছে। ঈদের মৌসুমে রাতে এসব সড়কে গাড়ি চালানো মানেই বিপদের সঙ্গে বাজি ধরা। অথচ সড়ক মেরামতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও তার সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ঈদযাত্রায় বিশেষ ঝুঁকির কারণ
ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হওয়ার আরও কিছু কারণ রয়েছে। এ সময় একসঙ্গে কোটিরও বেশি মানুষ রাস্তায় নামেন। ঢাকা থেকে বের হওয়ার রাস্তাগুলোতে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকার পর খোলা রাস্তা পেলে চালকরা হারানো সময় পুষিয়ে নিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন—এই মনোভাবই বহু দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
এ ছাড়া ঈদের মৌসুমে অনেক অনিবন্ধিত ও ভাড়া করা যানবাহন রাস্তায় নামে—পিকআপ, মাইক্রোবাস, এমনকি ট্রাকেও মানুষ বহন করা হয়। এসব যানবাহন যাত্রী পরিবহনের জন্য উপযুক্ত নয়; এতে যাত্রী নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও মানুষ বাধ্য হয়ে এগুলো ব্যবহার করেন—কারণ নির্ধারিত বাসের টিকিট পাওয়া যায় না বা ভাড়া বেশি হয়। এই বাস্তবতা রাষ্ট্রের পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে।
রাতের ভ্রমণ নিয়েও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। পরিসংখ্যান বলছে, ঈদের মৌসুমে মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশই ঘটে রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে। এ সময় চালকের ঘুমের প্রবণতা বাড়ে, রাস্তার দৃশ্যমানতা কমে যায়, পথচারীকে দেখা কঠিন হয়। তবুও দিনের যানজট এড়াতে রাতে যাত্রার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই বাস্তবতায় অন্তত অভিজ্ঞ ও সতেজ চালক নিশ্চিত করা জরুরি।
রাষ্ট্র ও পরিবহন মালিকদের দায়
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার ফল। রাষ্ট্র যদি সত্যিই চাইত, তবে এই মৃত্যুমিছিল অনেক আগেই থামানো যেত। কিন্তু পরিবহন খাতে রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই গভীর যে, এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঈদের আগে প্রতি বছর পুলিশ ও বিআরটিএ ‘বিশেষ অভিযান’-এর ঘোষণা দেয়। গণমাধ্যমে বড় বড় শিরোনাম হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব অভিযানের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলে, লাইসেন্সবিহীন চালক গাড়ি চালান, ওভারলোডেড বাস হাইওয়েতে ছুটে যায়—চেকপোস্ট পার হওয়ার পরই যেন সব নিয়ম শিথিল হয়ে যায়। এই প্রহসন আর কতদিন চলবে?
পরিবহন মালিকদের দায়ও কম নয়। একজন মালিক যখন জেনেশুনে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামান, ক্লান্ত চালককে দিয়ে একটানা গাড়ি চালান—তখন তিনি কি দায়মুক্ত থাকতে পারেন? আইনের চোখে হয়তো তিনি নির্দোষ, কিন্তু নৈতিকভাবে তাঁর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
২০১৮ সালে ঢাকায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা আজ অনেকটাই স্তিমিত। কিন্তু সমস্যাটি তো থেমে নেই; বরং আরও জটিল হয়েছে। সেই আন্দোলনের দাবিগুলোর বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সন্তোষজনক নয়।
যাত্রীর দায়িত্ব ও করণীয়
শুধু রাষ্ট্র বা পরিবহন মালিকদের দায় দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে।
প্রথমত, ঈদের একেবারে শেষ মুহূর্তে যাত্রা করার প্রবণতা পরিহার করা উচিত। যত দেরিতে রওনা দেওয়া হবে, তত বেশি ভিড় এবং ক্লান্ত চালকের মুখোমুখি হতে হবে। সম্ভব হলে ঈদের দুই-তিন দিন আগেই যাত্রা করা নিরাপদ।
দ্বিতীয়ত, বাসের ছাদে বা দরজায় ঝুলে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে—যত জরুরিই হোক না কেন। প্রতি বছরই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণে বহু প্রাণহানি ঘটে।
তৃতীয়ত, রাতের বাসে ভ্রমণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা জরুরি। সম্ভব হলে দুইজন চালক রয়েছে—এমন পরিবহন বেছে নেওয়া উচিত।
চতুর্থত, গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হবে। মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক—শুধু আইন এড়ানোর জন্য নয়, নিজের নিরাপত্তার জন্য।
পঞ্চমত, চালকের বেপরোয়া আচরণ চোখে পড়লে প্রতিবাদ করতে হবে। এটি যাত্রীর অধিকার এবং দায়িত্ব।
চালকের সচেতনতা ও দায়িত্ব
একজন চালক শুধু একজন পেশাজীবী নন; তিনি একসঙ্গে বহু মানুষের জীবনের দায়িত্ব বহন করেন। অতিরিক্ত ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো মানে যাত্রীদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। চালকদের উচিত—ক্লান্ত লাগলে বিরতি নেওয়া, প্রয়োজন হলে গাড়ি থামানো। মালিকের চাপের চেয়ে যাত্রীর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান—এই বোধটি গড়ে তুলতে হবে। মোটরসাইকেল চালকদের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। ঈদের সময় দূরপাল্লার মোটরসাইকেল যাত্রা, হেলমেট ছাড়া বা অতিরিক্ত আরোহী নিয়ে চলাচল—এসব মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
সরকারের কাছে জরুরি দাবি
সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। প্রথমত, চালকের বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, গতিনিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চতুর্থত, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দ্রুত ও সহজে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রকাশ নয়, বরং কারণ বিশ্লেষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা চাই
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়। সঠিক নীতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা থাকলে এ সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, ঘরে ফেরার পথ হোক নিরাপদ। ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন যাত্রাপথ নিরাপদ থাকে। তাই আসুন—এই ঈদে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, নিরাপদে চলব, সচেতন থাকব এবং অন্যকেও সচেতন করব।
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়; এটি আমাদের মৌলিক অধিকার।













