ঈদ কার্ডের কথা উঠলেই কি মনে পড়ে না ছোটবেলার সেই রঙিন দিনগুলোর কথা? লাল, নীল, সবুজ—ছোট ছোট কার্ড, যার ওপর আঁকা থাকত টম অ্যান্ড জেরি, মিকি মাউস, সিন্ড্রেলা, মিনা কার্টুন, বেন টেন, বার্বি কিংবা কখনো জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার নায়ক–নায়িকার ছবি। ছোট্ট সেই কার্ডগুলো যেন ঈদের আনন্দের এক আলাদা ভাষা প্রকাশ করত।
ঈদের আগে স্কুলের পাশের স্টেশনারি দোকান এবং পাড়া-মহল্লার ছোট ছোট ইদ কার্ডের দোকানগুলোতে ভিড় লেগে যেত। উদ্দেশ্য একটাই—বন্ধুদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও ইউনিক ঈদ কার্ড কেনা এবং ঈদে স্কুল ছুটির আগেই সবাইকে উপহার দেওয়া। কেউ যেন বাদ না পড়ে। কোন কার্ডটা কাকে দেওয়া হবে, কোনটা বেশি সুন্দর, কোনটা কারও সাথে মিলে যায় কি না—এসব নিয়ে তখন কত ভাবনা, কত পরিকল্পনা! ছোট্ট বয়সেই যেন কাজ করত এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে এখন একটি মেসেজ, একটি পোস্ট বা স্ট্যাটাসের মাধ্যমেই ঈদের শুভেচ্ছা জানানো যায়। এতে যোগাযোগ সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই অপেক্ষার আনন্দ, হাতে লেখা শুভেচ্ছার আন্তরিকতা।
ছুটি শুরুর আগের দিন, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুদের হাতে তুলে দেওয়া হতো সেই কার্ডগুলো। ভেতরে লেখা থাকত ছোট্ট একটি শুভেচ্ছা—“ঈদ মোবারক।” দাম ছিল মাত্র ৫, ১০ বা ২০ টাকা, কিন্তু সেই কার্ডের আবেগ তখন লক্ষ টাকার চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে হতো।
বন্ধুদের পাশাপাশি প্রতিবেশী বা কাজিনদের মাঝেও চলে কার্ডের আদান-প্রদান। চাঁদরাত বা ঈদের সকালে সবাই যখন নিজের পাওয়া কার্ডগুলো একত্র করত, তখন শুরু হতো আরেক ধরনের প্রতিযোগিতা—কার কার্ডটা বেশি সুন্দর, কে কাকে কী লিখেছে। ভাইবোনদের মাঝে ছোট ছোট তর্ক, হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে ঈদের আনন্দ যেন আরও বহুগুণে বেড়ে যেত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে এখন একটি মেসেজ, একটি পোস্ট বা স্ট্যাটাসের মাধ্যমেই ঈদের শুভেচ্ছা জানানো যায়। এতে যোগাযোগ সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই অপেক্ষার আনন্দ, হাতে লেখা শুভেচ্ছার আন্তরিকতা।
তবুও মানুষ স্বভাবতই স্মৃতিকাতর। তাই নতুনভাবে আবার ঈদ কার্ডের প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই প্রিয়জনদের জন্য নিজ হাতে কার্ড তৈরি করছেন, কেউ আবার দোকান থেকে বাহারি নকশার শুভেচ্ছা কার্ড কিনে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল যুগে তৈরি হয়েছে নতুন সংস্কৃতি—মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে “ইদ সালামি” পাঠানো। বিশেষ করে বিকাশের মাধ্যমে ইদ সালামি পাঠানো এখন বেশ জনপ্রিয়। ইনবক্সে ভেসে আসে মজার বার্তা—“ইদের চাঁদ আকাশে, সালামি দিন বিকাশে!”
এক সময় সালামি দেওয়ার প্রচলন ছিল বড়দের কাছ থেকে ছোটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন সমবয়সীদের মধ্যেও সালামি দেওয়ার এক নতুন ধারা গড়ে উঠেছে। অনেক সময় সেই ডিজিটাল সালামির সঙ্গে ছোট্ট একটি শুভেচ্ছা বার্তাও যোগ করা যায়—যা ছোটবেলার ঈদ কার্ডের অনুভূতিকে নতুনভাবে মনে করিয়ে দেয়।
মাধ্যম বদলেছে, সময় বদলেছে—তবুও ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানানোর অনুভূতিটা একই রয়ে গেছে। অনলাইন হোক বা অফলাইন, যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও যদি আমরা একটু আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনতে পারি, তবে ঈদের আনন্দও ফিরে পাবে তার পুরোনো উজ্জ্বলতা।
লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : [email protected]













