নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, একটি সমাজের আত্মা কেমন, তা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় সেই সমাজ তার শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দেখলে। কথাটি আজ আমাদের জন্য নিছক একটি উদ্ধৃতি নয়, বরং আত্মজিজ্ঞাসার এক নির্মম আয়না। কারণ, যে সমাজের শিশুরা স্কুলব্যাগের পরিবর্তে মাদক বহন করে, সেই সমাজের আত্মা কোন নিকষ অন্ধকারে নিমজ্জিত, তা অনুমান করা কঠিন নয়।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে পেটের ভেতর ইয়াবা বহন করে পাচারের সময় ৯ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের পেট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ইয়াবা। অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে একটি চক্র এই কোমলমতি শিশুদের ব্যবহার করেছে। যে বয়সে তাদের বিদ্যালয়ে থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের শরীরকেই বানানো হয়েছে মাদক পাচারের বাহন! এর চেয়ে নির্মমভাবে একটি শিশুর শৈশবকে আর কীভাবে অপমান করা যায়?
শিশুদের যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে, সেই অমানুষদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোন এলাকায়, কোন পরিবারে, কোন পরিস্থিতিতে শিশুরা অপরাধী চক্রের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে, তাও শনাক্ত করতে হবে
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে মাদক পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের প্রায় ২৫ শতাংশই শিশু, যাদের অধিকাংশের বয়স ১৬ বছরের নিচে। আরেক গবেষণায় দেখা যায়, পথশিশুদের ২১ শতাংশকে মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দেশব্যাপী ১ হাজার ৬০০ পথশিশুর ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় ৫৮ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো মাদক গ্রহণের কথাও জানিয়েছিল। সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় রাজধানী ঢাকায় ১৫ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের মাদক বিক্রির সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে। এসব পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, মাদক ব্যবসার বিস্তার কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি আমাদের শিশুদের ভবিষ্যতের ওপরও সরাসরি নির্মম আঘাত।
উন্নত বিশ্বও এই বিপদের বাইরে নয়। তবে তারা বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে থাকে। সেসব দেশে শিশুরা অপরাধে জড়িয়ে পড়লে কেবল সেই অপরাধের বিচারই করা হয় না, বরং কে বা কারা তাকে ব্যবহার করল, কীভাবে ব্যবহার করল এবং কেন সে অপরাধীদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করল—সেই প্রশ্নগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা হয়। সমস্যাটিকে সেখানে কেবল ‘শিশুর অপরাধ’ হিসেবে দেখা হয় না; বরং দেখা হয় ‘চাইল্ড ক্রিমিনাল এক্সপ্লোয়িটেশন’ বা শিশুদের ‘অপরাধে শোষণের শিকার’ হিসেবে। একই সঙ্গে পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা সংস্থার সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত ও সুরক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়। আন্তর্জাতিক আইনও এই ক্ষেত্রে বেশ শক্ত। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুদের মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবহার এবং মাদক উৎপাদন ও পাচারে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, শিশুকে অপরাধের হাতিয়ার বানানো কোনোভাবেই কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হতে পারে না, এটি শিশুর মৌলিক অধিকারেরও সরাসরি লঙ্ঘন।
অতএব, শিশুদের যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে, সেই অমানুষদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোন এলাকায়, কোন পরিবারে, কোন পরিস্থিতিতে শিশুরা অপরাধী চক্রের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে, তাও শনাক্ত করতে হবে। শিশুদের সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করাও আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ অথচ যাদের রক্ষা করার কথা, তাদেরই আমরা কখনো দারিদ্র্যের সুযোগে, কখনো লোভ দেখিয়ে, কখনো-বা অপরাধী চক্রের কৌশলে অগ্নিগর্ভের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি। এটি সত্যিই মানবিকতার চরম পরাজয়।
মনে রাখতে হবে, শিশুর ছোট্ট পেট মাদক বহনের পাত্র নয়, এটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন ধারণের স্থান। সেই স্বপ্নের ভেতর মাদক ঢুকিয়ে দেওয়া মানে শুধু একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের হাতে তুলে দেওয়া। যে সমাজ নিষ্পাপ-অবুঝ শিশুদের ব্যবহার করে এহেন জঘন্য অপকর্ম করতে পারে, সেই সমাজের আত্মা নিশ্চিতভাবেই অসুস্থ ও কলুষিত। উইলি ব্রান্ট যেমনটি বলেছেন, ‘শিশুদের প্রতি করা প্রতিটি অন্যায় সারা মানবতার জন্যই একটি কলঙ্ক।’












