গ্রামবাংলার যে উঠানে একসময় সন্ধ্যা নামলেই ছেলেরা ফুটবল-ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত থাকত, যে চায়ের দোকানে বসে তরুণেরা গ্রামের উন্নয়ন, চাকরি কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে গল্প করত—সেই উঠান, সেই আড্ডা, সেই চায়ের দোকানেই এখন কখনো কখনো ঢুকে পড়ছে মাদকের অন্ধকার। শহরের অলিগলি পেরিয়ে সর্বনাশা ইয়াবা পৌঁছে গেছে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত জনপদেও। বিষয়টি শুধু উদ্বেগের নয়, রীতিমতো শঙ্কার।
একটি গ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি তার যুবসমাজ। তারাই আগামী দিনের কৃষক, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, শিক্ষক, সমাজকর্মী কিংবা নেতৃত্বের জায়গায় আসবে। তাদের শ্রম ও মেধার ওপর দাঁড়িয়ে একটি পরিবার যেমন এগিয়ে যায়, তেমনি এগিয়ে যায় একটি গ্রাম, একটি উপজেলা, এমনকি পুরো দেশ। অথচ সেই সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি অংশ আজ মাদকের ভয়াল ছোবলে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইয়াবার বিস্তার এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা নয়; এটি গ্রামীণ সমাজের জন্যও বড় ধরনের সামাজিক সংকেত।
মাদকের ভয়াবহতা বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর দেশে অ্যামফিটামিন-জাতীয় মাদক ট্যাবলেট উদ্ধার হয়েছে ৪ কোটি ৩৫ লাখের বেশি। আগের বছর উদ্ধার হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ২৯ লাখ। এক বছরের ব্যবধানে উদ্ধার হওয়া ট্যাবলেটের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। অবশ্য উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণকে সরাসরি মোট সেবনের পরিমাণ বলা যাবে না। কিন্তু বিপুল এই উদ্ধার মাদক সরবরাহের বিস্তার ও বাজারের চাহিদা সম্পর্কে গুরুতর বার্তা দেয়।
শুধু অভিযান চালিয়ে তাই মাদকের বিস্তার বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজন একই সঙ্গে সরবরাহ ও চাহিদা—দুই দিকেই আঘাত করা। যারা সীমান্ত দিয়ে মাদক আনে, যারা এর অর্থের জোগান দেয়, যারা বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে এবং যারা মাদক ছড়িয়ে দেয়—তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে
ইয়াবার বিস্তার ঠেকাতে সীমান্তেও অভিযান চলছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করছে। অর্থাৎ মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক এখন যথেষ্ট বিস্তৃত। সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশের পর এসব মাদক শুধু বড় শহরে থেমে থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে জেলা, উপজেলা, বাজার এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মাদক পরিবহনের পথও যেন সহজ হয়েছে। একসময় যে মাদককে শহরের সমস্যা মনে করা হতো, এখন সেটিই গ্রামের কিশোর-তরুণদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
মাদক গ্রহণের শুরুটা অনেক সময় খুব নিরীহভাবে হয়—কৌতূহল থেকে। বন্ধুর প্ররোচনা, আড্ডা, হতাশা কিংবা নিজেকে আধুনিক প্রমাণের ভুল মানসিকতা থেকেও কেউ প্রথমবার ইয়াবার সংস্পর্শে আসতে পারে। অনেকের ধারণা থাকে, ‘একবার নিলে কিছু হবে না।’ কিন্তু সেই একবারই কখনো কখনো তাকে এমন এক পথে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
এরপর বদলে যেতে থাকে জীবন। লেখাপড়ায় অমনোযোগ, কর্মক্ষেত্রে অনিয়ম, পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব, অর্থের প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ—একটির পর একটি লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। যে তরুণের চোখে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন থাকার কথা, তার চিন্তার বড় অংশজুড়ে তখন জায়গা করে নেয় মাদক। ধীরে ধীরে পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শুধু মাদকবিরোধী পোস্টার টাঙিয়ে বা বছরে একদিন সভা করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, বন্ধুত্বের চাপ, হতাশা, আসক্তির ঝুঁকি ও সাহায্য পাওয়ার পথ সম্পর্কে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে
আর একজন তরুণের মাদকাসক্তির মূল্য শুধু তাকেই দিতে হয় না; দিতে হয় পুরো পরিবারকে। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারের ওপর তৈরি হয় বাড়তি আর্থিক চাপ। শুরু হয় মিথ্যাচার, চুরি, পারিবারিক অশান্তি। কোথাও কোথাও সহিংসতাও দেখা দিতে পারে। একজনের নেশা কখনো কখনো মা-বাবার দীর্ঘদিনের সঞ্চয় শেষ করে দেয়, ভাই-বোনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে এবং একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে।
গ্রামে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারণ এখানে সামাজিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সবাই সবাইকে চেনে। ফলে কোনো পরিবারের সন্তান মাদকে জড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সামাজিক পরিচিতিই আবার অনেক পরিবারের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। লোকলজ্জা, সামাজিক অপমান কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কথা চিন্তা করে অনেক পরিবার মাদকাসক্ত সন্তানের বিষয়টি গোপন রাখে। ফলে সময়মতো চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। সমস্যা তখন আরও গভীরে চলে যায়।
এখানে আমাদের একটি মানসিক পরিবর্তন জরুরি। মাদক বিক্রেতা ও পাচারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে—এ বিষয়ে কোনো ছাড়ের সুযোগ নেই। কিন্তু মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে চলবে না। অনেক ক্ষেত্রে সে নিজেও আসক্তির শিকার। তার প্রয়োজন চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন। তাকে ঘৃণা করে দূরে ঠেলে দিলে সে আরও বেশি মাদকের দিকে ঝুঁকতে পারে।
একজন তরুণ যখন মাদক থেকে ফিরে আসে, তখন শুধু একটি জীবনই রক্ষা পায় না—রক্ষা পায় একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, কখনো পুরো একটি সমাজ। আর একজন তরুণ যখন মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন ক্ষতিটিও শুধু তার একার হয় না
দেশে মাদকাসক্ত মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাও কম নয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মাদকনির্ভরতার চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু এই সংখ্যাকে মোট মাদকাসক্ত মানুষের প্রকৃত চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেকেই চিকিৎসার আওতায় আসেন না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ, দক্ষ কাউন্সেলর এবং পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
আর এখানেই বড় প্রশ্ন—গ্রামের একজন মাদকাসক্ত তরুণ চিকিৎসা নিতে কোথায় যাবে? তার পরিবারই বা কীভাবে জানবে কোথায় গেলে কার্যকর চিকিৎসা পাওয়া যাবে? অনেক সময় নিকটবর্তী উপজেলা বা জেলা পর্যায়েও প্রয়োজনীয় সেবা সহজলভ্য থাকে না। ফলে পরিবারটি হয় সমস্যাটি লুকিয়ে রাখে, নয়তো নানা অনিয়মিত ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আশ্রয় নেয়।
শুধু অভিযান চালিয়ে তাই মাদকের বিস্তার বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজন একই সঙ্গে সরবরাহ ও চাহিদা—দুই দিকেই আঘাত করা। যারা সীমান্ত দিয়ে মাদক আনে, যারা এর অর্থের জোগান দেয়, যারা বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে এবং যারা মাদক ছড়িয়ে দেয়—তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের মাদকের বিকল্প দিতে হবে।
একটি মাঠ যদি পরিত্যক্ত থাকে, একটি যুবকেন্দ্র যদি অচল থাকে, কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন যদি কার্যক্রম না চালায়, তাহলে সেখানে অন্য কিছু জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পায়। তাই গ্রামে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, পাঠাগার, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের শুধু ‘মাদক থেকে দূরে থাকো’ বললেই হবে না; তাদের সামনে বিকল্প স্বপ্নও তৈরি করতে হবে।
পরিবারের ভূমিকাও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন এসেছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। তবে নজরদারি যেন অবিশ্বাসে পরিণত না হয়। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করাই বেশি কার্যকর। কারণ অনেক তরুণ সমস্যায় পড়লেও পরিবারের কাছে তা বলতে ভয় পায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু মাদকবিরোধী পোস্টার টাঙিয়ে বা বছরে একদিন সভা করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, বন্ধুত্বের চাপ, হতাশা, আসক্তির ঝুঁকি ও সাহায্য পাওয়ার পথ সম্পর্কে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী প্রথমবার সমস্যায় পড়ার সময় যদি সহায়তা পায়, তাহলে তাকে গভীর আসক্তির দিকে যাওয়ার আগেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, মাদকবিরোধী লড়াইকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ক্রীড়া সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং অভিভাবকদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ মাদক কোনো একক পরিবারের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের সমস্যা।
একজন তরুণ যখন মাদক থেকে ফিরে আসে, তখন শুধু একটি জীবনই রক্ষা পায় না—রক্ষা পায় একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, কখনো পুরো একটি সমাজ। আর একজন তরুণ যখন মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন ক্ষতিটিও শুধু তার একার হয় না।
তাই ইয়াবার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি আমাদের গ্রামের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লড়াই। শহরের পর গ্রামেও যদি মাদকের শিকড় আরও গভীরে চলে যায়, তাহলে আগামী দিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে অনেক বড়।
আজ যে ছেলেটি মাঠে থাকার কথা, সে যদি মাদকের আড্ডায় থাকে; যে তরুণের হাতে বই বা কাজের সরঞ্জাম থাকার কথা, তার হাতে যদি ইয়াবা উঠে আসে—তাহলে দায় শুধু তার নয়, আমাদেরও।
আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামীকাল হয়তো প্রশ্ন উঠবে— যে যুবসমাজ দিয়ে একটি গ্রাম এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তাদের আমরা কোথায় হারিয়ে ফেললাম?













