একসময় গ্রামের সন্তানদের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে ভালো একটি চাকরি করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং সুযোগ পেলে নিজের গ্রামেই কিছু করা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই স্বপ্নের বড় একটি অংশ এখন শহরকেন্দ্রিক। সচরাচর উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম ছাড়েন তরুণ-তরুণীরা। এরপর চাকরি, ক্যারিয়ার, সন্তানদের শিক্ষা কিংবা নাগরিক সুযোগ-সুবিধার কারণে শহরেই স্থায়ী হয়ে যান পরিবার পেতে। একটা সময়ে এসে দেখা যায়, যে মানুষটি একদিন গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল ভবিষ্যৎ গড়তে, সেই মানুষটির আর গ্রামে ফেরার ফুরসতই মেলে না!
শহরে আসা যেন অনেকের জন্য এভাবে এক ‘একমুখী যাত্রা’য় পরিণত হয়েছে। আর এতে করে শহরের ওপর যে কী মারাত্মক ছাপ পড়ছে, তা কল্পনারও বাইরে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, শহরের রাস্তায় এখন যেন পা ফেলাই দায়!
গ্রামের ধুলোমাটিতে বেড়ে ওঠা একজন শিক্ষিত তরুণ শহরে এসে প্রথমে খুঁজে নেন চলার মতো কোনো একটি চাকরি। এরপর বাসা, পরিবহন, সন্তানের স্কুল, চিকিৎসা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা—সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন ধীরে ধীরে শহরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কয়েক বছর পর গ্রামে ফিরে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার চিন্তাটিই তখন হয়ে ওঠে জটিল ও কঠিন। এ যেন সত্যিই এক অদ্ভুত খেলা!
গ্রাম থেকে শহরে আসা অপরাধ নয়; বরং সুযোগের সন্ধানে এটি স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন মানুষ শহরে এসে নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে এবং চাইলেও আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ খুঁজে পায় না
অন্যদিকে, গ্রামের বাস্তবতাও অনেক ক্ষেত্রে তাকে ফিরতে উৎসাহ যোগায় না। শিক্ষিত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, মানসম্মত শিক্ষা ও পেশাগত বিকাশের সুযোগ না থাকায় শহরই হয়ে ওঠে প্রধান আশ্রয়স্থল। ফলে গ্রামের মেধাবী ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতিতেও পড়ছে।
যে তরুণরা গ্রামের নেতৃত্ব দিতে পারতেন, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি আনতে পারতেন, ছোট শিল্প গড়ে তুলতে পারতেন কিংবা স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারতেন, তাদের অনেকেই আজ শহরের চাকরির বাজারে নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজছেন। ফলে গ্রামে থেকে যাচ্ছে মূলত প্রবীণ মানুষ, কৃষিনির্ভর পরিবার এবং সীমিত সুযোগের মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠী।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, শিক্ষিত মানুষকে কি কেবল শহরেই সফল হতে হবে?
একজন শিক্ষিত তরুণ যদি নিজের এলাকায় থেকেই সম্মানজনক আয় করতে পারেন, তাহলে কেন তিনি গ্রাম ছেড়ে শহরে আসবেন? যদি উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোট শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কাজ, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তাহলে গ্রামের তরুণদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
গ্রামকে শুধু বসবাসের জায়গা হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষিত তরুণদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সহজ শর্তে ঋণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অনলাইনভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠার সুযোগ বাড়াতে হবে। এর কারণ, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় শহরের উঁচু ভবন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র তখনই ফুটে উঠবে, যখন গ্রামের একজন শিক্ষিত তরুণ নিজের গ্রামেই থেকে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।
গ্রাম থেকে শহরে আসা অপরাধ নয়; বরং সুযোগের সন্ধানে এটি স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন মানুষ শহরে এসে নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে এবং চাইলেও আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ খুঁজে পায় না।
সুতরাং, আজ প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষা মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করবে না; বরং শিক্ষা মানুষকে নিজের গ্রামকে গড়ে তোলার শক্তি দেবে।
শহরের দিকে মানুষের এই একমুখী স্রোত থামাতে হলে গ্রামেই তৈরি করতে হবে নতুন সম্ভাবনার দরজা। তা না হলে একদিন হয়তো গ্রামের সন্তানরা সবাই শহরে থাকবে, আর গ্রাম পড়ে থাকবে শুধু তাদের স্মৃতির পাতায়! আহা, কেমন হবে সেই সব দিন!













