দেশে মোটরসাইকেল বা বাইক দুর্ঘটনা এখন নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। দুর্ঘটনার খবর আমাদের কাছে এতটাই পরিচিত ও গা-সওয়া হয়ে গেছে যে, অনেক সময় একটি মৃত্যুর খবরও যেন কেবল আরেকটি সংখ্যা হয়ে আসে। অথচ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন, কয়েকজন অপেক্ষমাণ মানুষ এবং একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৬ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত গতি, নিয়ন্ত্রণ হারানো, মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ভারী যানবাহনের ধাক্কাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। ফলে সড়কে এই বাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
অর্থাৎ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহতাকে এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশি ১৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। দেশের কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশের এভাবে সড়কে জীবন হারানোর চিত্র কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বরং এটি আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দিকেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। প্রশ্ন আছে আরেক জায়গায়—মোটরসাইকেল এভাবে কিশোরদের হাতে উঠে যাচ্ছে কীভাবে? এই ভয়ংকর প্রবণতা কীভাবে শুরু হলো? যে বয়সে তাদের বিদ্যালয়ের মাঠে থাকার কথা, বই হাতে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে তারা মহাসড়কে শতাধিক কিলোমিটার গতিতে বাইক নিয়ে ছুটছে।
আমরা যেন ভুলে না যাই, একটি তরুণের জীবন ফিরিয়ে আনা যায় না। একটি মায়ের অপেক্ষা, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একটি পরিবারের স্বপ্নও ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সময়মতো কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিলে পরবর্তী মৃত্যুটিকে হয়তো ঠেকানো সম্ভব। একটি জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব কি আমরা এখনো বুঝে উঠব না?
ভেবে দেখার বিষয়, পরিবার সন্তানকে বাহন কিনে দিচ্ছে; কিন্তু দায়িত্ববোধ শেখাচ্ছে কি? রাষ্ট্র লাইসেন্স দিচ্ছে; কিন্তু চালানোর যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করছে কি? সমাজ বেপরোয়া গতিকে নিরুৎসাহিত করছে কি? তবে এটাও সত্য যে, দায় কেবল চালকের একার নয়। নিরাপদ ও সহজলভ্য গণপরিবহনের ঘাটতি, অসহনীয় যানজট, দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ—সবকিছু মিলেই সমস্যাটিকে আরও জটিল করেছে। অবশ্য এসব অজুহাতে বেপরোয়া গতিকে বৈধতা দেওয়া যায় না। নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার পাশাপাশি একজন বেপরোয়া চালক পথচারী ও অন্য যানবাহনের যাত্রীদের জীবনও বিপন্ন করে তোলেন।
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক দেশ সড়কনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গতি নিয়ন্ত্রণ, কঠোর লাইসেন্সিং, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, মানসম্মত হেলমেট এবং দ্রুত জরুরি সেবাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের দেশেও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। কিশোরদের মোটরসাইকেল চালানো বন্ধে বয়স ও লাইসেন্স যাচাই আরও কঠোর করতে হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে গতি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি অবৈধ উচ্চ শব্দের হর্ন ও পরিবর্তিত সাইলেন্সারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়কনিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। সর্বোপরি নিশ্চিত করতে হবে সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন। মানুষ যদি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা পায়, তাহলে কেউই জীবন হাতে নিয়ে মোটরসাইকেলে ছুটে চলার মতো দুঃসাহস করবে না।
বাইক দুর্ঘটনার বাড়াবাড়ি দেখে অনেকে মোটরসাইকেলকে ‘মরণসাইকেল’ বলে থাকেন। যদিও মোটরসাইকেল কোনো ‘মরণযান’ নয়; কিন্তু দায়িত্বহীন গতি, আইন অমান্য এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এটি মৃত্যুর বাহনে পরিণত হতে পারে। অতএব, প্রশ্নটি শুধু ‘বাইক চালানোর সময় আমরা সতর্ক হব কি না’—এতটুকু নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—আর কত প্রাণ ঝরার পর আমরা বুঝব, সড়কনিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। আমরা যেন ভুলে না যাই, একটি তরুণের জীবন ফিরিয়ে আনা যায় না। একটি মায়ের অপেক্ষা, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একটি পরিবারের স্বপ্নও ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সময়মতো কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিলে পরবর্তী মৃত্যুটিকে হয়তো ঠেকানো সম্ভব। একটি জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব কি আমরা এখনো বুঝে উঠব না?














