সভ্য রাষ্ট্রের একটি বড় মানদণ্ড হলো—রাষ্ট্র তার হেফাজতে থাকা মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা হয়তো অপরাধী, অভিযুক্ত কিংবা বিচারাধীন বন্দি হতে পারেন; কিন্তু তারা কেউই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব হারান না। তাদের জীবনের অধিকার, চিকিৎসার অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সম্প্রতি গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত ‘কারাগারে ডাক্তার ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটে বাড়ছে মৃত্যু’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেশের কারাগারগুলোতে এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গভীর ব্যর্থতারই ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭৪টি কারাগারের মধ্যে ৫৪টিতেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। অর্থাৎ, কোনো বন্দি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা গুরুতর আঘাতের মতো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ন্যূনতম ব্যবস্থাও অনেক কারাগারে অনুপস্থিত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট মোকাবিলায় অনেক সময় লেগুনা কিংবা ভাড়ার সাধারণ যানবাহন ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার ৫৯০ জন। অথচ বাস্তবে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজারের বেশি। অর্থাৎ, অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যেই বন্দিরা বসবাস করছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। কারা অধিদপ্তরের অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৬টি থাকলেও বর্তমানে স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন মাত্র দুইজন চিকিৎসক।
প্রশ্ন হলো, একটি দেশে যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা নানা খাতে ব্যয় হয়, সেখানে কারাগারের জন্য কয়েক ডজন চিকিৎসক ও কিছু অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে বছরের পর বছর কেন অপেক্ষা করতে হয়? বিগত শাসনামল থেকে বর্তমান সময়—সব পক্ষই সমস্যাটির কথা জানে। বৈঠক হয়েছে, চিঠি চালাচালি হয়েছে, পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব গেছে; কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। এই দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা কেবল একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবার, কিছু স্বজনের দীর্ঘ যন্ত্রণা। কোনো বন্দি যদি সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার দায় শুধু ভাগ্যের ওপর চাপানো যায় না। এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত অবহেলা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নও বটে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কারাগারের অধিকাংশ বন্দিই এখনো আদালতে দোষী সাব্যস্ত হননি। বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা বিপুল। অর্থাৎ, যাদের অপরাধ এখনো আইনি দৃষ্টিতে প্রমাণিত হয়নি, তারাও অমানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার শিকার হচ্ছেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই বাস্তবতা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
ইতিবাচক দিক হলো, সম্প্রতি ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের অনুমোদন মিলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি যথেষ্ট? শুধু যানবাহন সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন প্রতিটি কারাগারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, জরুরি ওষুধ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থাপনা।
কারাগারকে কেবল শাস্তির স্থান হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সংশোধন ও পুনর্বাসনের স্থানও বটে। কোনো মানুষকে সংশোধনের আগেই অবহেলায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।
বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আলোচনায় প্রায়ই কারাগারের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। অথচ রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিক চেহারা অনেক সময় এই দেওয়ালের আড়ালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা যদি সত্যিই মানবিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়তে চাই, তাহলে এই ধরনের অমানবিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি। অন্যথায় কারাগারের দেওয়ালের আড়ালে নীরবে বাড়তেই থাকবে মৃত্যু, আর সভ্য রাষ্ট্র হওয়ার প্রচেষ্টা সীমাবদ্ধ থাকবে কেবল পরিকল্পনা ও মুখের কথায়।













