বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখোশের আড়ালে আবারও মাথা তুলছে জাতিগত আধিপত্যবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণ ও আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো প্রযুক্তিতে যত উন্নত হয়েছে, মানবিকতায় ততটা নয়—বরং বহু ক্ষেত্রে আরও নির্মম হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তার বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে ভারত।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা কেবল একটি সরকারের নীতি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক রূপান্তরের বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, মিডিয়া ন্যারেটিভ, ধর্মীয় আবেগ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদ—সব মিলিয়ে সেখানে এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে, যেখানে ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের জন্য নাগরিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নাগরিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, সম্পত্তি দখল, সামাজিক বয়কট ও রাজনৈতিক ভয়ভীতি—এসবকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অস্থিরতার সরাসরি ভৌগোলিক অভিঘাত। কারণ, ভারত কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বাংলাদেশের চারপাশ ঘিরে থাকা এক বিশাল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ সংকট কখনোই কেবল ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সংকটে ক্লান্ত। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি চাপ এখনো বহন করছে রাষ্ট্র। এর ভেতরে যদি নতুন করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে উদ্বাস্তু প্রবাহ শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। “পুশ-ইন” নিয়ে যে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে, সেগুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সীমান্ত রাজনীতি অনেক সময় মানবাধিকারের ভাষা বোঝে না; বোঝে কেবল রাষ্ট্রীয় স্বার্থ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল হবে, যদি তারা এখনো কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য কূটনীতিকেই যথেষ্ট মনে করে। বিজেপির কাছে চিঠি পাঠানো, কূটনৈতিক ভদ্রতা রক্ষা করা—এসব প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু যথেষ্ট নয়। কারণ, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় দুর্বল রাষ্ট্রের ভদ্রতা অনেক সময় শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব পায় না, যদি তার পেছনে কৌশলগত সক্ষমতা না থাকে।
এখন প্রয়োজন বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত বোঝাপড়া বৃদ্ধি, মুসলিম বিশ্বের মানবাধিকার প্রশ্নে সমন্বিত অবস্থান তৈরি—এসব এখন বাংলাদেশের বাস্তব প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব কমাতে হবে। কারণ, ভবিষ্যতের ভূরাজনীতি হবে জোট, প্রভাববলয় ও কৌশলগত অবস্থানের রাজনীতি। সেখানে একা থাকা মানে ঝুঁকির মধ্যে থাকা।
আরেকটি বাস্তবতা হলো চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক আধিপত্যের বিপরীতে চীন এখন শক্তিশালী ভারসাম্যকারী শক্তি। অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বেইজিংয়ের উপস্থিতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাংলাদেশকে এমন কূটনৈতিক বোকামি করা চলবে না, যেখানে একদিকে ভারতীয় চাপ থাকবে, অন্যদিকে চীনকে অকারণে দূরে ঠেলে দেওয়া হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগের বিষয় নয়; এটি স্বার্থের খেলা।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হচ্ছে—বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য অস্থিরতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ভুয়া ছবি, একটি গুজব বা একটি উসকানিমূলক পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ফলে সরকারের দায়িত্ব শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলার সক্ষমতাও তৈরি করা।
আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি এখনো বাস্তবতা বুঝতে প্রস্তুত, নাকি পুরোনো কূটনৈতিক ভদ্রতার ভেতর ঘুমিয়ে থাকবে?
কারণ, পৃথিবী এখন আর নরম ভাষার পৃথিবী নয়। এটি শক্তির পৃথিবী; কৌশলের পৃথিবী; রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পৃথিবী।
যে রাষ্ট্র সময়ের আগেই বিপদের গন্ধ বুঝতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই দাঁড়ায়। আর যে রাষ্ট্র বাস্তবতা অস্বীকার করে, ইতিহাস তাকে করুণা পর্যন্ত করে না।
-
মীর খসরুজ্জামান হিল্লোল একজন রাজনৈতিক সচেতন নাগরিক ও কবি; ই-মেইল : [email protected]
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













